এশিয়ার শেয়ারবাজার সোমবার বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে, যখন ওয়াল স্ট্রিট ফিউচারের ধারাবাহিক পতন এবং মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্থির বিক্রির ধাক্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। করপোরেট আয় ঘোষণার মৌসুম, একাধিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী বৈঠক এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের আগে সপ্তাহের শুরুতেই বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
মূল্যবান ধাতুতে তীব্র বিক্রি, মার্জিন চাপ বাড়ছে
রুপার দামে একপর্যায়ে আরও ১০ শতাংশ পতন দেখা যায়। এর আগের শুক্রবারেই রুপার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত লিভারেজ নেওয়া বিনিয়োগকারীরা বড় চাপে পড়েন। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, চীনে ইউবিএস এসডিআইসি সিলভার ফিউচার্স ফান্ডের ওপর চাপ এই পতনকে আরও তীব্র করে তোলে। মার্জিন কল মেটাতে অনেক বিনিয়োগকারী লাভজনক অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অস্থিরতা আরও বেড়েছে, কারণ সিএমই স্বর্ণ ও রুপাসহ একাধিক ফিউচার্স চুক্তিতে মার্জিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

তেলের দামে বড় পতন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কিছুটা কমার ইঙ্গিত
তেলের দামও চার শতাংশের বেশি কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছে। এতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়।
এশিয়ার প্রধান বাজারে বড় ধস
এই অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে। কসপি সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে যায়, যা গত বছরের এপ্রিলের শুল্কজনিত অস্থিরতার পর সবচেয়ে বড় একদিনের পতন।
জাপান বাদে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারের এমএসসিআই সূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে। চীনের ব্লু-চিপ সূচক প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পায়, বিশেষ করে স্বর্ণসংশ্লিষ্ট শেয়ারে বড় দরপতন দেখা যায়।
জাপানের নিক্কেই সূচকও ১ শতাংশ কমে যায়। যদিও একটি জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আসন্ন নিম্নকক্ষ নির্বাচনে বড় জয়ের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবু বাজারকে তা খুব বেশি সমর্থন দিতে পারেনি।

জয়ের ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক প্রণোদনা নীতির পথ সহজ হতে পারে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়লে বন্ড ও ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে দুর্বল মুদ্রা রপ্তানির জন্য ইতিবাচক বলে তাকাইচি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বাজারে আলোচিত।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে আয় ঘোষণার চাপ
ইউরোপেও এটি করপোরেট আয়ের ব্যস্ত সপ্তাহ। ইউরো স্টক্স বাজারমূল্যের প্রায় ৩০ শতাংশ কোম্পানি তাদের ফলাফল প্রকাশ করবে। ইউরো স্টক্স ফিফটি ও ড্যাক্স ফিউচার উভয়ই ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়, আর এফটিএসই ফিউচার ০ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ফাইভ হান্ড্রেড ফিউচার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নাসডাক ফিউচার ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে। বিনিয়োগকারীরা এখন আয় প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছেন, কারণ এই ফলাফলই উচ্চ মূল্যায়ন ধরে রাখার মূল ভরসা। চলতি সপ্তাহে এসঅ্যান্ডপি ফাইভ হান্ড্রেডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কোম্পানি ফল প্রকাশ করবে। আয় বৃদ্ধির হার বর্তমানে গত বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ, যেখানে শুরুতে বাজারের প্রত্যাশা ছিল ৭ শতাংশ।
বিশেষ নজর থাকবে বড় প্রযুক্তি কোম্পানির দিকে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যয় ও তার সুফল নিয়ে। মাইক্রোসফটের হতাশাজনক ফলাফলের পর এই খাত নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছে, এ বছর এআই হাইপারস্কেলারদের মূলধনী ব্যয়ের সম্মিলিত পূর্বাভাস বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি।

মুদ্রাবাজারে ডলার স্থিতিশীল, ইয়েনে চাপ
মুদ্রাবাজারে ডলার কিছুটা স্থিতিশীল দেখা যায়। ইয়েনের দুর্বলতায় ডলার ১৫৫ দশমিক শূন্য শূন্য স্তরে পৌঁছায়। ইউরোও সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়ে ডলারের বিপরীতে বেড়ে যায়।
ডলারের সাম্প্রতিক শক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী চেয়ার হিসেবে সাবেক ফেড গভর্নর কেভিন ওয়ারশকে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাজারের ধারণা, তিনি দ্রুত সুদহার কমানোর পক্ষে অন্য কিছু সম্ভাব্য প্রার্থীর মতো আক্রমণাত্মক নাও হতে পারেন, যদিও বর্তমান চেয়ারের তুলনায় তিনি কিছুটা নমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই কারণেই বাজারে এ বছর দুটি সুদহার কমানোর প্রত্যাশা এখনো বহাল আছে, তবে জুনের আগে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া জানুয়ারির কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এই প্রত্যাশায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ইংল্যান্ডের ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী বৈঠকও রয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যতিক্রম, কারণ বাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা দেখছে যে তারা সুদহার বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ করতে পারে, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সামাল দিতে।

পণ্যমূল্যে চরম অস্থিরতা
পণ্যবাজারে অস্থিরতাই প্রধান বৈশিষ্ট্য। স্বর্ণের দাম ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৬৬৫ ডলারে নেমে আসে, আগের শুক্রবারেই প্রায় ১০ শতাংশ পড়ে যাওয়ার পর। রুপার দাম শেষ পর্যন্ত ৭ শতাংশ কমে ৭৮ দশমিক ৬১ ডলারে দাঁড়ায়, লেনদেন ছিল অত্যন্ত অস্থির।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ ও রুপা কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের ধারণা, নিরাপদ সম্পদের চাহিদা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমলে স্বর্ণের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
এদিকে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় তেলের বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৬৬ দশমিক ৩০ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড নেমে আসে ৬২ দশমিক ১৯ ডলারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















