০৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ঘরে ঘরে মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা এবং ঘাড় ব্যথা কিসের ইঙ্গিত ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কে টানাপোড়েন, ট্রাম্প নির্ভরতা কমাতে নতুন পথে ইউরোপ পণ্যমূল্যের ধসে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, সোনায় ইতিহাসের বড় পতন বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে এআই ব্যবহার করবে ভারতের মহারাষ্ট্র মৃত্যু ভয়, ভালোবাসা আর সৃষ্টির নির্জনতা: ‘হ্যামনেট’-এর নির্মাতার অন্তর্গত লড়াই চীনমুখী পশ্চিমা মিত্ররা, আমেরিকাকে এড়িয়ে নতুন হিসাব শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যা মামলা: বিএনপি প্রার্থীসহ চল্লিশ জনের জামিন ভোটেই জবাব দিন অপমানের, নারীদের প্রতি অবমাননার রাজনীতির অবসান ঘটান: তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে শেখ হাসিনার নামে ৬৬৩ মামলা, হত্যার অভিযোগ ৪৫৩টি অ্যাপলের দ্বিতীয় ফোল্ডেবল আইফোন হতে পারে ছোট ক্ল্যামশেল মডেল, বড় সংস্করণ ২০২৯ পর্যন্ত বিলম্বিত

চীনমুখী পশ্চিমা মিত্ররা, আমেরিকাকে এড়িয়ে নতুন হিসাব

বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া শুল্ক আর কূটনৈতিক চাপের জেরে পশ্চিমা মিত্রদের ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সেই ফাঁকেই নিজের অবস্থান শক্ত করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ক্ষুব্ধ ইউরোপ ও কানাডার মতো দেশগুলো এখন ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, তবে শর্ত নির্ধারণ করছে চীনই।

ট্রাম্পের শুল্কের পর চীনের কৌশল

গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের হঠাৎ শুল্ক আরোপে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগে। সেই সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, চীন সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে। বাস্তবে উল্টোটা হয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট বার্তা দেয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে চীনের বাণিজ্য সীমিত করবে, তাদেরও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণায়ও চীন কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বকে লক্ষ্য করে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ইচ্ছাকৃতভাবেই এই চাপ বাড়ান, যাতে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি বেইজিংকেও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে বাধ্য হয় মিত্র দেশগুলো। লক্ষ্য ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি সামলাতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবে এবং তখন চীনের স্বার্থে বেশি নমনীয় হবে।

Mark Carney and Xi Jinping standing smiling at each other in front of flags of Canada and China.

ইউরোপ ও কানাডার নতুন যাত্রা

এই কৌশলের ফল এখন স্পষ্ট। ইউরোপ ও কানাডার শীর্ষ নেতারা একের পর এক বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। মানবাধিকার, গুপ্তচরবৃত্তি, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির মতো পুরোনো বিরোধে চীন খুব কম ছাড় দিলেও সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ বাড়ছে পশ্চিমে।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কয়েক বছরের শীতলতা কাটিয়ে বেইজিং সফরে ব্যবসায়িক চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেন। বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে তিনি সতর্ক থাকেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবার চীন সফরে গিয়ে বাস্তববাদী পুনর্গঠনের কথা বলেন। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কিছু শুল্ক কমানোর পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করেন, অর্থনৈতিক টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে সরে আসতেও কানাডা প্রস্তুত।

বেইজিংয়ের লাভ আর ওয়াশিংটনের ক্ষতি

Emmanuel Macron closely surrounded by police and young people reaching out to shake his hand.

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের দূরত্ব যত বাড়ছে, চীনের কূটনৈতিক লাভ তত স্পষ্ট হচ্ছে। ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক নীতি আর সামরিক পদক্ষেপের সুযোগে চীন নিজেকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে, আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পথ সহজ করেছে।

ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিনল্যান্ডসহ একাধিক দেশের নেতা ইতিমধ্যেই বেইজিংমুখী হয়েছেন। জার্মানির নতুন চ্যান্সেলরের সফরও প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে চীন নিজেকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

চাপের রাজনীতি আর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কূটনীতিতে নয়, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও পড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে চীনের সমর্থন কিংবা বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মতো ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাইওয়ান প্রশ্নেও দেশগুলো আরও সতর্ক হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার সংসদ সদস্যদের তাইওয়ান সফর বাতিল তার ইঙ্গিত দেয়।

Two men carrying a metal frame in the shape of one side of a two door car.

তবে চীনের ভেতরেও সবাই মনে করেন না, এটি স্থায়ী পরিবর্তন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি পশ্চিমাদের স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সমাধান। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রই, আর চীনের রপ্তানি ও ভর্তুকিনীতিতে অনেক দেশ এখনও অসন্তুষ্ট।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দোলাচল আর কড়া নীতির সুযোগে চীন এখন কূটনৈতিক মঞ্চে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু এই ঝোঁক স্থায়ী হবে নাকি সময়ের সঙ্গে আবার বদলাবে, তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত আর বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘরে ঘরে মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা এবং ঘাড় ব্যথা কিসের ইঙ্গিত

চীনমুখী পশ্চিমা মিত্ররা, আমেরিকাকে এড়িয়ে নতুন হিসাব

০৫:১৭:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া শুল্ক আর কূটনৈতিক চাপের জেরে পশ্চিমা মিত্রদের ভেতরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সেই ফাঁকেই নিজের অবস্থান শক্ত করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ক্ষুব্ধ ইউরোপ ও কানাডার মতো দেশগুলো এখন ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, তবে শর্ত নির্ধারণ করছে চীনই।

ট্রাম্পের শুল্কের পর চীনের কৌশল

গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের হঠাৎ শুল্ক আরোপে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগে। সেই সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, চীন সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে। বাস্তবে উল্টোটা হয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট বার্তা দেয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে চীনের বাণিজ্য সীমিত করবে, তাদেরও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণায়ও চীন কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বকে লক্ষ্য করে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ইচ্ছাকৃতভাবেই এই চাপ বাড়ান, যাতে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি বেইজিংকেও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে বাধ্য হয় মিত্র দেশগুলো। লক্ষ্য ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি সামলাতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবে এবং তখন চীনের স্বার্থে বেশি নমনীয় হবে।

Mark Carney and Xi Jinping standing smiling at each other in front of flags of Canada and China.

ইউরোপ ও কানাডার নতুন যাত্রা

এই কৌশলের ফল এখন স্পষ্ট। ইউরোপ ও কানাডার শীর্ষ নেতারা একের পর এক বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। মানবাধিকার, গুপ্তচরবৃত্তি, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির মতো পুরোনো বিরোধে চীন খুব কম ছাড় দিলেও সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ বাড়ছে পশ্চিমে।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কয়েক বছরের শীতলতা কাটিয়ে বেইজিং সফরে ব্যবসায়িক চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেন। বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে তিনি সতর্ক থাকেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবার চীন সফরে গিয়ে বাস্তববাদী পুনর্গঠনের কথা বলেন। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কিছু শুল্ক কমানোর পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করেন, অর্থনৈতিক টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে সরে আসতেও কানাডা প্রস্তুত।

বেইজিংয়ের লাভ আর ওয়াশিংটনের ক্ষতি

Emmanuel Macron closely surrounded by police and young people reaching out to shake his hand.

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের দূরত্ব যত বাড়ছে, চীনের কূটনৈতিক লাভ তত স্পষ্ট হচ্ছে। ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক নীতি আর সামরিক পদক্ষেপের সুযোগে চীন নিজেকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে। ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে, আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পথ সহজ করেছে।

ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিনল্যান্ডসহ একাধিক দেশের নেতা ইতিমধ্যেই বেইজিংমুখী হয়েছেন। জার্মানির নতুন চ্যান্সেলরের সফরও প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে চীন নিজেকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

চাপের রাজনীতি আর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কূটনীতিতে নয়, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও পড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে চীনের সমর্থন কিংবা বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মতো ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাইওয়ান প্রশ্নেও দেশগুলো আরও সতর্ক হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার সংসদ সদস্যদের তাইওয়ান সফর বাতিল তার ইঙ্গিত দেয়।

Two men carrying a metal frame in the shape of one side of a two door car.

তবে চীনের ভেতরেও সবাই মনে করেন না, এটি স্থায়ী পরিবর্তন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি পশ্চিমাদের স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সমাধান। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রই, আর চীনের রপ্তানি ও ভর্তুকিনীতিতে অনেক দেশ এখনও অসন্তুষ্ট।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দোলাচল আর কড়া নীতির সুযোগে চীন এখন কূটনৈতিক মঞ্চে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু এই ঝোঁক স্থায়ী হবে নাকি সময়ের সঙ্গে আবার বদলাবে, তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত আর বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।