জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে দেশজুড়ে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫৩টি মামলাই হত্যা অভিযোগে। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই তথ্য জানায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
মামলার সামগ্রিক চিত্র
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মোট এক হাজার সাতশ পঁচাশি টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে হত্যা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে সাতশ ছত্রিশটি। শেখ হাসিনার নাম রয়েছে এই হত্যা মামলাগুলোর চারশ তিপ্পান্নটিতে।
তদন্ত ও অভিযোগপত্রে ধীরগতি
টিআইবি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মাত্র একশ ছয়টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগপত্র রয়েছে একত্রিশটি। এই পরিসংখ্যান তদন্ত কার্যক্রমের ধীরগতি স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে সাবেক ক্ষমতাসীন সরকারের একশ আটাশ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
গবেষণায় উঠে এসেছে, একই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সাতশ একষট্টি টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এক হাজার একশ আটষট্টি জন কর্মরত ও সাবেক পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন একষট্টি জন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি এখনো সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থার বাইরে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবস্থা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত চারশ পঞ্চাশটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে পঁয়তাল্লিশটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় মোট দুইশ নয় জন আসামির নাম রয়েছে এবং চুরাশি জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে বারোটি মামলা বিচারাধীন, যেখানে একশ পাঁচ জন আসামি জড়িত। টিআইবি বলছে, অনেক আসামিই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং তাদের পলায়নে সামরিক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
নির্বিচার মামলা ও হয়রানির অভিযোগ

প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বিচারে মামলা দায়ের নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব মামলায় সারা দেশে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলা বাণিজ্য, প্রতিশোধমূলক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মামলায় নাম ঢোকানো বা বাদ দেওয়ার হুমকিতে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা
টিআইবি মনে করে, বিচার শুরুর মতো কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও দুর্বল মামলার ভিত্তি, ঘটনার সঙ্গে নির্দিষ্ট অভিযোগের অভাব, জটিল তদন্ত প্রক্রিয়া এবং স্পষ্ট ঘটনার বর্ণনা না থাকায় বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়া বিচারক ও কৌঁসুলিদের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের নাম জড়ানো
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। রায় সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলা হলেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পুরোপুরি মানা না হলে প্রকৃত অপরাধীরা দায় এড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে টিআইবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















