চলচ্চিত্র নির্মাণকে অনেকেই ক্ষমতা আর কৃতিত্বের জগৎ হিসেবে দেখেন। কিন্তু খ্যাতি, পুরস্কার আর সাফল্যের আড়ালে যে গভীর একাকিত্ব, ভয় আর আত্মঅন্বেষণের গল্প লুকিয়ে থাকে, তা খুব কম পরিচালকই প্রকাশ্যে বলেন। ‘হ্যামনেট’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা ক্লোয়ে ঝাও সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের ভেতরের ভয়, মৃত্যুচিন্তা আর ভালোবাসার সংকটকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না।
চলচ্চিত্রে আলাদা স্বর গড়ে তোলার পথ
মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই ক্লোয়ে ঝাও নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। স্বাধীন চলচ্চিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করে অ-পেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করা ছিল তাঁর প্রথম দিকের বৈশিষ্ট্য। সেই পথ ধরেই তৈরি হয় মানবিক বেদনা আর নিঃসঙ্গতার কাব্যিক ছবি ‘নোম্যাডল্যান্ড’, যা তাঁকে এনে দেয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। পরে তিনি বড় বাজেটের মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন, আবার ফিরে আসেন গভীর মানবিক গল্পে। সাম্প্রতিক ছবি ‘হ্যামনেট’ এক সন্তান হারানোর শোক, ভালোবাসা আর মৃত্যু চিন্তার আবর্তে ঘুরে বেড়ানো এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।

পরিচালকের একাকিত্ব আর সৃষ্টির পরিবার
ঝাও মনে করেন, পরিচালক হিসেবে কাজ করা মানেই এক ধরনের নিঃসঙ্গ যাত্রা। একেকটি চলচ্চিত্রে তিনি একটি অস্থায়ী পরিবার গড়ে তোলেন, কাজ শেষ হলে সেই পরিবার ভেঙে যায়। পুরস্কার অনুষ্ঠান বা যৌথ আলোচনার আসর তাঁকে সেই একাকিত্ব থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। অন্য পরিচালকদের কাজ কাছ থেকে দেখার আগ্রহ তাঁর শেখার তৃষ্ণারই প্রকাশ। তাঁর বিশ্বাস, একে অপরের কাজের ভেতরে প্রবেশ না করলে শেখা থেমে যায়।
অরাজকতাকে গ্রহণ করার দর্শন
‘হ্যামনেট’ নির্মাণের সময় পরিকল্পনার চেয়ে মুহূর্তের সত্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ঝাও। কোনো কোনো দৃশ্যে আগাম আলোচনা ছাড়াই অভিনয় হয়েছে। অভিনেত্রীর হঠাৎ বেরিয়ে আসা কান্না, সেটে ছড়িয়ে পড়া অনুভূতির কম্পন—এসবই তাঁর কাছে সত্যিকারের সৃষ্টির মুহূর্ত। তাঁর মতে, যখন এমন কিছু ঘটে যা কেউ আগে কল্পনাও করতে পারেনি, তখনই শিল্প সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মৃত্যুচিন্তা আর মৃত্যুদূতের পথে হাঁটা
ঝাও অকপটে স্বীকার করেন, সারা জীবন তিনি মৃত্যুকে ভয় পেয়েছেন। সেই ভয়ই তাঁকে পুরোপুরি বাঁচতে, পুরো হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে বাধা দিয়েছে। এই ভয় কাটাতেই তিনি মৃত্যুদূতের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে মৃত্যু ও শোকের ধারণা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, প্রিয়জন হারানোর বেদনা কখনো বদলায় না, বদলায় শুধু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। আধুনিক পৃথিবীতে মৃত্যুকে অস্বীকার করার প্রবণতা শোককে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে বলে তাঁর বিশ্বাস।
মধ্যবয়সী সংকট আর পুনর্জন্মের অনুভব
চল্লিশের কোঠায় এসে নিজের ভেতরের ভাঙনকে ঝাও দেখেন এক ধরনের রূপান্তর হিসেবে। তিনি বলেন, জীবনের এক পর্যায়ে এসে পুরোনো পরিচয়, পুরোনো চাওয়াগুলো ভেঙে পড়ে। সেই সময়টা কঠিন, কখনো কখনো অসহনীয়। তবু সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই নতুন জন্মের পথ তৈরি হয়। তাঁর জীবনে ‘হ্যামনেট’ ঠিক সেই সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন তিনি নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

ভালোবাসা, বিচ্ছেদ আর অন্তর্গত ঘর
পরিবার, দেশ আর সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা তাঁকে বারবার পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়ে ভুগিয়েছে। তাঁর মতে, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো নিজের গোষ্ঠী থেকে ছিটকে পড়া। কাজ, সাফল্য, পুরস্কার—সবকিছুই অনেক সময় সেই অন্তর্গত নিরাপত্তাহীনতা ঢাকতে ব্যবহৃত হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেছেন, যে ঘর কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না, তা হলো নিজের ভেতরের ঘর, প্রকৃতি আর অদৃশ্য বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে সংযোগ।
সাফল্য আর আত্মতৃপ্তির সম্পর্ক
ঝাও মনে করেন, পুরস্কার বা আর্থিক সাফল্য কখনোই মানুষের আত্মা মূল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। জীবনের অর্ধেক সময় আনন্দে ভরা, আর বাকি অর্ধেক কষ্টে। সেই কষ্টের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়াই আসল শিক্ষা। তিনি সেই কষ্টকে বলেন জীবনের সার, যা শেষ পর্যন্ত নতুন কিছু জন্ম দেয়।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















