লাতিন আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্যের প্রবল আগমন ঘটেছে। ব্রাজিল, মেক্সিকো ও চিলির মতো দেশগুলো সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অনলাইন পণ্যের ঢলে উদ্বিগ্ন। অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষায় শুল্ক বাড়ানো হলেও চীনা বিনিয়োগ ও ঋণের উপর নির্ভরতার কারণে সরকারগুলো কঠিন অবস্থায় পড়েছে।
চীনা ব্র্যান্ড বাজার দখল করছে
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্রাজিলে বিক্রি হওয়া ৬১ হাজারেরও বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ির ৮০ শতাংশেরও বেশি ছিল বাইডি ও জিডব্লিউএম-এর মতো চীনা ব্র্যান্ড। মেক্সিকোতে চীনা গাড়ির বাজার দখল ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বেইজিংয়ের বিশাল ভর্তুকি ও কম উৎপাদন খরচের কারণে চীনা নির্মাতারা স্থানীয় ও আমেরিকান ব্র্যান্ডের তুলনায় অনেক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে।
একই সঙ্গে তেমু ও শিনের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো অল্প দামে পোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি সামগ্রী সরবরাহ করছে। চীনা স্মার্টফোন ও যন্ত্রপাতি নির্মাতারাও আগ্রাসী মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা ও জাপানি ব্র্যান্ডের বাজার ভাগ কেড়ে নিচ্ছে। এসব সস্তা পণ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালে এলেও স্থানীয় উৎপাদকরা বাজার হারাচ্ছে এবং বেকারত্বের আশঙ্কা বাড়ছে।
শুল্ক বাড়ালেও চীনা বিনিয়োগে নির্ভরতা
চীনা পণ্যের আগ্রাসন ঠেকাতে মেক্সিকো ও ব্রাজিল নির্দিষ্ট পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে এবং ছোট পার্সেলের কর ছাড় বাতিল করছে। ব্রাজিল ৫০ ডলারের নিচে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা তুলে নিচ্ছে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানিতে উচ্চ কর আরোপ করছে। চিলি নিম্নমূল্যের পণ্যে ১৯ শতাংশ ভ্যাট চালু করেছে।
তবে এসব পদক্ষেপ পণ্যের ঢল কমাতে পারেনি। কারণ হলো অঞ্চলটির চীনের উপর গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীন প্রায় ১৫৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অনুদান দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে মাত্র ৫০.৭ বিলিয়ন ডলার। মেক্সিকোর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আর্জেন্টিনার ঘাটতি ৮.২ বিলিয়ন ডলার।

এমনকি ব্রাজিল, যা চীনে সয়াবিন ও লৌহ আকরিক রফতানি করে বড় আয় করে, দেখছে যে সমাপ্ত পণ্যের আমদানির ফলে তাদের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ হোসে মানুয়েল সালাসার-শিরিনাচস বলেন, চীন আর শুধু সাধারণ পণ্যের রফতানিকারক নয়, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নেতা হয়ে উঠেছে। চীনা ইভি ও স্মার্টফোনে অত্যাধুনিক ব্যাটারি ও প্রসেসর থাকায় স্থানীয় শিল্পগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ছে।
অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের গভীর সংযোগ
রাস্তা, বন্দর, রেললাইন, বাঁধ ও টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক নির্মাণে চীনা ঋণ ও বিনিয়োগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেন, রাজনৈতিক নেতারা চীনা বিনিয়োগ প্রত্যাখ্যান করলে অবকাঠামো প্রকল্প থমকে যেতে পারে। চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এতটাই গভীর যে কোনো আকস্মিক বিচ্ছেদ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, সস্তা চীনা পণ্য লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে, যা সুরক্ষাবাদ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে দোটানা—একদিকে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা ও চাকরি রক্ষা করা, অন্যদিকে সাশ্রয়ী দামের পণ্য ও অর্থায়নের সুযোগ বজায় রাখা।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, যাতে তারা চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে। চীন যেমন ঐ অঞ্চলের জন্য বড় বাজার, তেমনি লাতিন আমেরিকা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস। এই পারস্পরিক নির্ভরতা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কৌশল নির্ধারণ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















