জাপান থেকে শুরু করে ব্রাজিল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনগুলো চলতি বছরে আর্থিক বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ওঠানামা ও বাড়তি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এমনিতেই চাপে থাকা বাজারে ভোটের ফল বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ২০২৬ সাল জুড়েই ভোটের হাওয়া
২০২৬ সালকে বলা হচ্ছে ভোটে ভরা একটি বছর। উন্নত ও উদীয়মান—দুই ধরনের অর্থনীতিতেই একের পর এক নির্বাচন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। কোথাও ঋণ ও বাজেট ঘাটতি, কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয়, আবার কোথাও রাজনৈতিক দিকবদলের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বাজারের অস্থিরতা বাড়ছে।

জাপান: হঠাৎ নির্বাচন ও ঋণের চাপ
জাপানে ৮ ফেব্রুয়ারির আকস্মিক নির্বাচন সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ব্যয়বহুল রাজস্ব নীতির পক্ষে সমর্থন আদায় করতে চাইছেন। বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত উন্নত অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে সরকারি বন্ডে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছর জাপানের ১০ বছরের বন্ডের সুদহার তিন শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইয়েনের গতিপথও আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সুদের ব্যবধানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে না, কারণ রাজস্ব প্রণোদনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
কলম্বিয়া: ডানপন্থার দিকে মোড়ের প্রত্যাশা
মার্চ থেকে শুরু করে একাধিক ধাপে কলম্বিয়ায় সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। বিদায়ী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর পর দেশটি কোন পথে যাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কৌতূহল তুঙ্গে। গত বছর শেয়ারবাজার ভালো করলেও বন্ড বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী ঝোঁক কলম্বিয়াতেও ফিরবে এবং অর্থনৈতিক নীতিতে শৃঙ্খলা আসবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে বাজেট সংস্কারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

হাঙ্গেরি: দীর্ঘ শাসনের পরীক্ষা
এপ্রিলে হাঙ্গেরির নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিরোধী মধ্য-ডানপন্থী দল টিসজা জনমত জরিপে এগিয়ে থাকলেও ফল অনিশ্চিত। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সরকার ভোটারদের মন পেতে ব্যয় বাড়িয়েছে, যার ফলে দেশটির আর্থিক অবস্থার পূর্বাভাস নেতিবাচক হয়েছে। বিরোধীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করে আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাজ্য: স্থানীয় ভোটেও নজর বাজারের
সাধারণত স্থানীয় নির্বাচন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের খুব একটা আগ্রহ জাগায় না। তবে মে মাসের ভোট ব্যতিক্রম হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের লেবার সরকার অর্থনীতি শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে এবং জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়েছে। নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেলেই বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে, যদিও বিশ্লেষকদের মতে বড় ধরনের ঋণ বাড়ানোর সুযোগ নতুন নেতৃত্বেরও থাকবে না।
ইথিওপিয়া ও জাম্বিয়া: ঋণসংকটের পর ভোট
ঋণখেলাপি অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকা ইথিওপিয়া ও জাম্বিয়ায় গ্রীষ্মে নির্বাচন। ইথিওপিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের জয় প্রায় নিশ্চিত হলেও বিরোধীদের বর্জনের ঘোষণা রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে। জাম্বিয়ায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট এগিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনে সংস্কারের সুফল পুরোপুরি পৌঁছায়নি। তবু সীমান্তবর্তী বাজার হিসেবে বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে দুই দেশেই।

ব্রাজিল: লুলা বনাম বলসোনারো পরিবারের উত্তরসূরি
অক্টোবরে ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এগিয়ে আছেন ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে। লুলার সম্ভাব্য জয় বাজারের জন্য নেতিবাচক হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন, কারণ বাজেট ঘাটতি ও ঋণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত, যা কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে স্বস্তির বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতির পরীক্ষা
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। জনমত জরিপে অর্থনীতি পরিচালনায় অসন্তোষ স্পষ্ট, আর ইতিহাস বলছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সাধারণত চাপে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ববাজারেও পড়বে।
এই নির্বাচনী বছর তাই শুধু রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গতিপথও নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















