ইংল্যান্ডের দক্ষিণ–পূর্ব উপকূলের ছোট শহর হেস্টিংসের ভেতরে এমন এক অদ্ভুত পাড়া আছে, যার নাম শুনলেই মনে হবে আপনি আটলান্টিক পেরিয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে এটি ব্রিটেনেরই অংশ। ‘আমেরিকা গ্রাউন্ড’ নামে পরিচিত এই ক্ষুদ্র এলাকা একসময় ছিল আইনশৃঙ্খলাহীন বসতি, আর তার জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও নতুন জীবনের স্বপ্ন থেকে।
স্বাধীনতার অনুপ্রেরণায় জন্ম
ঊনবিংশ শতকের শুরুতে হেস্টিংস যখন ধীরে ধীরে সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, তখন কিছু নির্মাণশ্রমিক শহরের পাশের পাথুরে সমুদ্রতটে অস্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। জায়গাটির মালিকানা স্পষ্ট না থাকায় তারা করও দিতেন না। ভাঙা নৌকা ও চোরাচালানিদের জাহাজের কাঠ ব্যবহার করে তৈরি হয় ঘরবাড়ি ও দোকান। ধীরে ধীরে সেখানে লৌহকার, ধোপা, রুটি প্রস্তুতকারকসহ নানা পেশার মানুষ বসবাস শুরু করলে গড়ে ওঠে স্বনির্ভর এক সমাজ।

এই বসতির মানুষরা নিজেদের ব্রিটিশ শাসনের বাইরে ভাবতে শুরু করেন। আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ তাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই কারণেই জায়গাটির জনপ্রিয় নাম হয়ে ওঠে ‘আমেরিকা’।
আইনের আওতায় ফেরা
অগোছালো বসতি ও প্রতিবেশী বিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত সরকার তদন্ত শুরু করে। আইনি মালিকানা না থাকায় ধীরে ধীরে বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে এলাকা পরিষ্কার করে সেখানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সড়ক গড়ে তোলা হয়। নদীটিকে মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার পর ‘আমেরিকা গ্রাউন্ড’ সম্পূর্ণভাবে হেস্টিংস শহরের অংশ হয়ে যায়, যদিও নামটি টিকে থাকে ইতিহাসের স্মারক হিসেবে।
অতীত থেকে বর্তমানের রূপান্তর
আজও তিনটি প্রধান সড়ককে ঘিরে এই এলাকার কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের ভবনে রয়েছে শিল্পীদের স্টুডিও, ছোট দোকান ও আবাসিক ফ্ল্যাট। কাছের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে প্রথম দিকের অস্থায়ী ঘরবাড়ির ছবি ও নকশা।

বিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটেনের অনেক সমুদ্রতীরবর্তী শহরের মতো হেস্টিংসও মন্দার মুখে পড়ে। তবে গত পনেরো বছরে শিল্পী, উদ্যোক্তা ও স্বতন্ত্র ব্যবসার আগমনে ‘আমেরিকা গ্রাউন্ড’ নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ছোট কফিশপ, শিল্পপ্রদর্শনী ও সৃজনশীল উদ্যোগ এলাকাটিকে আবারও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
উৎসব, সংস্কৃতি ও বিতর্ক
অতীতে এখানে মাঝে মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় ব্যবসা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের আয়োজন দেখা যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমসাময়িক বিতর্কের কারণে কিছু বাসিন্দা এখন বড় আকারের উদ্যাপনে অনীহা প্রকাশ করছেন।
সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতা
আজকের ‘আমেরিকা গ্রাউন্ড’ মূলত শিল্প, কারুশিল্প ও স্বাধীনচেতা উদ্যোগের কেন্দ্র। পুরোনো ভবন পুনর্নির্মাণ করে তৈরি হয়েছে সঙ্গীতমঞ্চ, সৃজনশীল কর্মক্ষেত্র ও তরুণদের জন্য সামাজিক প্রকল্প। রাস্তার শিল্পচিত্রে ভরা সরু গলিপথ এখন কমিউনিটির মিলনস্থল।

সমুদ্রতটের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সময় বদলালেও জায়গাটির আত্মা বদলায়নি। স্বাধীনতার পতাকা আর উড়তে না দেখা গেলেও উদ্যোগী মানসিকতা ও সৃজনশীল শক্তিই আজও ‘আমেরিকা গ্রাউন্ড’-এর আসল পরিচয়।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















