যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর টানা বোমাবর্ষণ শুরু করেছে, তার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ইরান এমনভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে যা এই অঞ্চলের অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদেরও বিস্মিত করেছে।
এই হামলাগুলো দ্রুত বিজয় বা শাসন পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পরও ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এখনো দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় রয়েছে।
অল্প কিছুদিন আগেও দেশে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের লক্ষণ দেখা গেলেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা উল্টো পুরো জাতিকে একত্র করেছে। ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার সম্ভাবনা এখন নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে—যা শুধু দেশটির ভেতরেই নয়, আশপাশের অঞ্চল ও বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
নেতৃত্বে ক্ষতি হলেও ভাঙেনি ঐক্য
ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা হারিয়েছে—যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি উল্লেখযোগ্য। তবুও যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মাঝেও জাতীয় ঐক্য দৃশ্যমানভাবে অটুট রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের কাছ থেকেও ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন, বিশেষ করে ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে।
ইরানের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর একটি বড় কারণ ছিল নেতৃত্বের দ্রুত প্রতিস্থাপন। প্রতিটি শূন্য পদে সঙ্গে সঙ্গে নতুন নেতা উঠে এসেছে, যেন তারা আগেই প্রস্তুত ছিল। ভবিষ্যতেও একই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা আঘাত
ইরান মূলত ড্রোন ও বিভিন্ন ক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রপন্থী আরব দেশগুলোর ওপর আঘাত হেনেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে ইসরায়েলের বহুল প্রশংসিত আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা এতদিন অত্যন্ত শক্তিশালী বলে বিবেচিত ছিল, সেটির দুর্বলতা ইরানের হামলায় স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ইরানের সশস্ত্র ড্রোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—যেগুলো রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল। মস্কোর সঙ্গে তেহরানের এই জোট কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘে রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইতে চায়, তখন ইরান মস্কোর সহায়তা পেতে পারে।
ধর্মীয় প্রেরণা ও রাজনৈতিক আচরণ
ইরানের ক্ষমতাসীনদের বেশিরভাগই শিয়া মুসলিম, যা তাদের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া সম্প্রদায়ের অনুপ্রেরণার উৎস সপ্তম শতাব্দীর কারবালার যুদ্ধ, যেখানে ইমাম হুসাইনের নেতৃত্বে ৭২ জন অনুসারী নিহত হন এবং নারী-শিশুরা বন্দি হন।
প্রায় ১৪০০ বছর ধরে এই ঘটনার স্মৃতি প্রতি বছর পুনর্জাগরিত হয় এবং তা শিয়া মুসলিমদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। তেল আমদানিকারক দেশগুলো এখন হঠাৎ অর্থনৈতিক চাপে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের দুর্বল অর্থনীতিগুলো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার দিকে এগোতে পারে।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে—যার মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগবে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব
কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই দেশগুলোর কিছু জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। এতে শুধু আয় কমেনি, বরং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও বেড়েছে।
যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে চাপ বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে সমালোচনাও তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যুদ্ধ কমানো বা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একই পথে হাঁটবেন কি না, তা অনিশ্চিত। ২০২৩ সালে গাজা আক্রমণ এবং পরবর্তীতে লেবাননে হামলার পর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে সংঘাতে জড়িত রয়েছেন।
সম্ভবত একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হতে পারে, তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা না হলে রক্তপাত বন্ধ হবে না।
বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বিংশ শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ফারহান বুখারি 

















