ইসরায়েলের নতুন পদক্ষেপ ও প্রেক্ষাপট
অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে একতরফা একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল সরকার। এই পদক্ষেপকে অনেকেই কার্যত সংযুক্তিকরণের দিকে অগ্রসর হওয়া হিসেবে দেখছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে সমালোচকদের দাবি। একই সঙ্গে এটি সাবেক অসলো শান্তিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
রবিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এক গোপন বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে নেতানিয়াহু নিজে প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিয়ে পশ্চিম তীর বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী পরে বিষয়টি বিস্তারিত জানান। এর মধ্যে ছিলেন কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের উপস্থিতি বাড়ানোর পক্ষে কাজ করে আসছেন।
স্মোট্রিচ এক বিবৃতিতে বলেন, তারা সমগ্র ‘ইসরায়েলের ভূমি’ জুড়ে নিজেদের শিকড় আরও গভীর করছেন এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে সমাধিস্থ করছেন।
ট্রাম্পের অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের বিরোধিতা করেছেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং গাজা-কেন্দ্রিক শান্তি পরিকল্পনায় তা স্পষ্ট করেছেন। এছাড়া ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের ওয়াশিংটনে বৈঠকের ঠিক আগে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব ও বসতি সম্প্রসারণ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর সরকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মনোযোগ মূলত গাজার দিকে থাকায় পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামরিক অভিযানের ফলে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এ অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
নতুন আইন ও জমি কেনার সুযোগ
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য জমি কেনা সহজ হবে। ১৯৬৭ সালের আগের একটি আইন বাতিল করা হয়েছে, যা পশ্চিম তীরের সম্পত্তি স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া অন্য কারও কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ করত। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে অর্থসমৃদ্ধ বসতি সংগঠনগুলো ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত এলাকাতেও জমি কিনতে পারবে। যেহেতু ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যেখানেই ইসরায়েলি নাগরিক থাকবেন, তাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য, তাই এসব কেনাবেচা নীতিগত পরিবর্তনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া জমি ক্রয়ের আগে ‘লেনদেন অনুমতি’ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। আগে এই অনুমতি জালিয়াতি বা প্রতারণা ঠেকাতে সহায়ক ছিল এবং সংবেদনশীল এলাকায় ক্রয় রোধ করার সুযোগ দিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

ভূমি রেজিস্ট্রি উন্মুক্তকরণ
পশ্চিম তীরের ভূমি রেজিস্ট্রি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এতদিন জমির নথি সিলগালা থাকায় অনুপস্থিত মালিকদের খুঁজে বের করা কঠিন ছিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আইনে ইহুদিদের কাছে জমি বিক্রি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হওয়ায় নথি গোপন থাকাটা বিক্রেতাদের সুরক্ষা দিত। এখন রেজিস্ট্রি উন্মুক্ত হলে বিক্রেতারা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা খর্ব
অসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐসব এলাকায় ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং পানি সংক্রান্ত বিষয়ে ইসরায়েলি প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এতে ফিলিস্তিনি স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে তাদের হাতে।
‘পিস নাউ’ সংগঠনের হাগিত ওফরান এ সিদ্ধান্তকে কঠোর ও দমনমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

হেবরন ও বেথলেহেমে পরিবর্তন
হেবরন শহরে নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় ফিলিস্তিনি পৌরসভার কাছ থেকে সরিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে মুসলিম ও ইহুদিদের পবিত্র স্থান ‘কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’-এ ফিলিস্তিনি মতামত ছাড়াই পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
বেথলেহেমে ‘র্যাচেলস টম্ব’ তত্ত্বাবধানে নতুন সংস্থা গঠন করা হয়েছে। এর ফলে সরকার সেখানে উন্নয়ন ও পাশের একটি ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি আরব ও মুসলিম দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল অবৈধ সংযুক্তিকরণ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতা হুসেইন আল-শেখ আরব লীগ, ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্রও ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরে সব বসতি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আইনি প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত অসলো চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দখলকারী শক্তি নিরাপত্তা বা স্থানীয় জনগণের কল্যাণ ছাড়া বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করতে পারে না। জমি কেনাবেচার আইন পরিবর্তন ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে নয় বলে মত বিশ্লেষকদের।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এটি সংযুক্তিকরণের দিকে এগোনোর এক কৌশলী পদক্ষেপ, যেখানে ‘সংযুক্তিকরণ’ শব্দটি ব্যবহার না করেই বাস্তবতা তৈরি করা হচ্ছে।

ডানপন্থী মহলের সমর্থন
অন্যদিকে পশ্চিম তীরের বসতি প্রতিনিধিত্বকারী ইয়েশা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ইয়িসরায়েল গাঞ্জ এসব পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, ইহুদিদের জমি কেনায় নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া বৈষম্যের অবসান ঘটিয়েছে। ভূমি রেজিস্ট্রি উন্মুক্ত করা স্বচ্ছতা ও আইনি নিশ্চয়তা বাড়াবে বলেও দাবি করেন তিনি। পরিবেশ দূষণ রোধে নেওয়া ব্যবস্থাগুলোকে তিনি রাজনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সামগ্রিকভাবে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন নীতিগত পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















