দীর্ঘ কয়েক দশকের সমৃদ্ধ অভিনয়জীবনের পর অবশেষে প্রথমবারের মতো অস্কারের মনোনয়ন পেলেন স্টেলান স্কারসগার্ড। নরওয়েজিয়ান পারিবারিক নাটক ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’তে অভিনয়ের জন্য ৭৪ বছর বয়সী এই সুইডিশ অভিনেতা সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে মনোনীত হয়েছেন। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চার বছর আগের একটি স্ট্রোক এবং সেই ধাক্কা সামলে নতুনভাবে কাজ শেখার গল্প।
প্রথম অস্কার মনোনয়ন, দীর্ঘ পথচলা
স্টেলান স্কারসগার্ডের অভিনয়জীবন শুরু সুইডিশ টেলিভিশনে। আন্তর্জাতিক সাফল্য আসে ১৯৯৬ সালে লার্স ভন ত্রিয়েরের ‘ব্রেকিং দ্য ওয়েভস’ ছবির মাধ্যমে। এরপর হলিউডে ‘গুড উইল হান্টিং’ ও ‘আমিস্তাদ’-এ অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি একদিকে ‘ডিউন’, ‘মামা মিয়া!’ ও পাঁচটি মার্ভেল ছবির মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কাজ করেছেন, অন্যদিকে ‘চেরনোবিল’ ও ‘অ্যান্ডর’-এর মতো টেলিভিশন সিরিজে শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবুও ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ তাঁকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছে, তা তাঁর ক্যারিয়ারে এক নতুন উচ্চতা।

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’: সম্পর্কের ভাঙাগড়ার গল্প
জোয়াকিম ত্রিয়ের পরিচালিত এই ছবিতে স্কারসগার্ড অভিনয় করেছেন গুস্তাভ বর্গ চরিত্রে। তিনি একজন আত্মমগ্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি ক্যারিয়ারের জন্য পরিবারকে অবহেলা করেন। এর ফলে বড় মেয়ে নোরার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে।
শিল্পীজীবনের সেরা সময় পেরিয়ে গেছে—এমন ধারণার মধ্যে বর্গ একটি ব্যক্তিগত গল্প নিয়ে নতুন ছবি বানাতে চান এবং নোরাকে তাতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু নোরা রাজি না হলে তিনি এক মার্কিন অভিনেত্রীকে নেন, যিনি পরিবারের পুরনো ক্ষত ও মানসিক টানাপোড়েন পুরোপুরি বুঝতে পারেন না।
ছবিটি সেরা ছবি সহ মোট নয়টি অস্কার মনোনয়ন পেয়েছে। স্কারসগার্ড এরই মধ্যে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে গোল্ডেন গ্লোব জিতেছেন।
স্ট্রোকের পর অভিনয়ের নতুন পদ্ধতি
চার বছর আগে স্ট্রোকের পর সংলাপ মুখস্থ করার ক্ষমতায় সমস্যা দেখা দেয় স্কারসগার্ডের। এখন শুটিং সেটে তিনি কানে একটি ইয়ারপিস ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে প্রম্পটার থেকে সংলাপ শোনানো হয়।
তাঁর কথায়, এই পদ্ধতিতে অভিনয়ের মান খুব একটা কমেনি। বরং কানে সংলাপ থাকলে নির্ভুলভাবে বলা যায়। তবে স্মৃতির সমস্যায় মাঝে মাঝে তিনি বিরক্ত হন। কথোপকথনের মাঝখানে ভাবনার সূত্র হারিয়ে ফেললে সেটি তাঁকে কষ্ট দেয়।
তিনি জানান, ‘অ্যান্ডর’ ও ‘ডিউন’-এর কাজেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ফল ভিন্ন হলেও সামগ্রিকভাবে অভিনয়ের মান ধরে রাখতে পেরেছেন বলে তাঁর বিশ্বাস।

সহকর্মীদের সমর্থন
স্ট্রোকের পর দ্রুত কাজে ফেরা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় ছিল। তবে ‘ডিউন’-এর পরিচালক ডেনিস ভিলনভ ও ‘অ্যান্ডর’-এর নির্মাতা টনি গিলরয় তাঁকে ভরসা দিয়েছেন। তাঁরা সময় নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেন। স্কারসগার্ড মনে করেন, আগের প্রতিশ্রুতি না থাকলে হয়তো তিনি হতাশায় ডুবে যেতেন এবং ফেরার সাহস পেতেন না।
পুরস্কার মৌসুম ও শিল্পের সংকট
পুরস্কার মৌসুম নিয়ে তাঁর মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য এই প্রচারব্যবস্থা জরুরি হলেও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতা তাঁকে হতাশ করে। তাঁর মতে, আজ সবকিছুই অর্থের মাপকাঠিতে বিচার হয়। শিল্পের গুণমান ও বাজারমূল্যের ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
তিনি মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থা লোভনির্ভর এবং নতুন প্রজন্মকে শেখানো হচ্ছে টিকে থাকতে হলে আত্মপ্রচারে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর জন্য আত্মপ্রচার প্রধান বিষয় হওয়া উচিত নয়।
তবুও চলচ্চিত্রজগৎ তাঁর কাছে বিশেষ। তাঁর ভাষায়, চলচ্চিত্র এখনো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে অদ্ভুত বা প্রান্তিক মানুষও আশ্রয় পায়।

পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা
স্কারসগার্ড নিজেকে পরিচালকের জগতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম অভিনেতা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, একটি ছবির কেন্দ্রে পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গিই মুখ্য। সহযোগিতা অবশ্যই থাকে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরিচালকের।
তিনি বলেন, বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রে নিজেকে নতুন করে ভাবেন। কারণ নতুন নির্মাতার নতুন ধারণা আগেভাগে বিচার করা ঠিক নয়।
স্বীকৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন
এই মৌসুমে কেউ প্রশংসা করলে তিনি সেটিকে ইতিবাচকভাবেই নেন। একজন অভিনেতার কাজ দর্শকের মনে প্রভাব ফেলতে পারলে সেটাই বড় সাফল্য। তবে একসময় পরিচালক মিলোশ ফোরম্যান তাঁকে বলেছিলেন, তাঁকে একাধিকবার পর্দায় দেখেও চিনতে পারেননি। চরিত্রে এতটাই ডুবে থাকেন যে ব্যক্তিগত পরিচয় আলাদা করে ধরা পড়ে না। স্কারসগার্ড এটিকে একই সঙ্গে প্রশংসা ও সমালোচনা হিসেবে দেখেন।
হলিউড নিয়ে ভাবনা
‘ব্রেকিং দ্য ওয়েভস’-এর আগে তাঁর হলিউডে বড় স্বপ্ন ছিল না। ইউরোপেই ভালো কাজ করছিলেন। পরে হলিউডে এলেও নির্ভরশীল হননি। তাঁর কাছে এটি কখনোই জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। ফলে তিনি স্বচ্ছন্দে কাজ বেছে নিতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, ভালো চরিত্র পাওয়া সবসময়ই কঠিন। প্রায় প্রতি দশ বছরে একটি করে অসাধারণ চরিত্র আসে—এটাই বাস্তবতা।
স্ট্রোকের ধাক্কা সামলে, নতুন পদ্ধতিতে অভিনয় করে এবং শিল্পের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে স্টেলান স্কারসগার্ড আজ অস্কার দৌড়ে অন্যতম আলোচিত নাম। ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্য নয়, ব্যক্তিগত প্রতিকূলতাকে জয় করারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















