জাপানের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) যখন একের পর এক কেলেঙ্কারি ও নির্বাচনী পরাজয়ে দিশেহারা, ঠিক তখনই দলের হাল ধরেন সানায়ে তাকাইচি। মাত্র ১১০ দিনের মাথায় তিনি এমন এক নির্বাচনী জয় এনে দিলেন, যা দলটির ৭১ বছরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ।
ঐতিহাসিক জয় ও সুপার মেজরিটি
রবিবারের আগাম নির্বাচনে এলডিপি ৪৬৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ৩১৬টি আসন পেয়ে সুপার মেজরিটি অর্জন করেছে। আগে তাদের আসন ছিল ১৯৮। এই জয়ের ফলে তাকাইচি তার কঠোর নীতির পক্ষে শক্তিশালী গণসমর্থনের দাবি করতে পারছেন। তার নীতির মধ্যে রয়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।
সোমবার টোকিওতে সংবাদ সম্মেলনে তাকাইচি বলেন, জনগণ জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার তার পরিকল্পনার ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি বলেন, জনগণ তাকে এই নীতিগত পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য শক্ত সমর্থন দিয়েছে।

সংকট থেকে পুনরুত্থান
গত গ্রীষ্মে এলডিপি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। আর্থিক কেলেঙ্কারি ও টানা নির্বাচনী পরাজয়ের ফলে দলীয় নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। সেই প্রেক্ষাপটে গত অক্টোবরে ৬৪ বছর বয়সী তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
দলটি ১৯৫৫ সালের পর থেকে মাত্র চার বছর বাদে সবসময়ই ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তারা কাউন্সিলর পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। ফলে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই তারা সংখ্যালঘু অবস্থায় পড়ে। এই পরিস্থিতিতে তাকাইচির উত্থান ছিল দলের জন্য বড় মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
জনসংযোগে ভিন্নধর্মী কৌশল
তাকাইচি সরাসরি ও প্রাণবন্ত ভাষায় কথা বলেন। কখনও কখনও তার বক্তব্যে দৃঢ় জাতীয়তাবাদী সুরও থাকে। তিনি মাঙ্গার সংলাপ উদ্ধৃত করেন, প্রিয় বেসবল দল হানশিন টাইগার্স ও রক ব্যান্ড বি’জ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এমনকি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পোশাক নির্বাচন নিয়ে নিজের দুশ্চিন্তার কথাও খোলাখুলি বলেন।
এই স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গি তরুণদের মধ্যে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তার দীর্ঘ একটি পোস্ট, যেখানে তিনি ছুটির সময়ের ব্যস্ততা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপ, উত্তর কোরিয়া ও ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত বিষয় এবং স্বামীর জন্য রান্নার কথা উল্লেখ করেন, ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে নিয়ে কে-পপ সুরে ড্রাম সেশনেও অংশ নেন তিনি। উল্লেখযোগ্য যে তাকাইচি নিজেও একজন অপেশাদার হেভি মেটাল ড্রামার।

জনপ্রিয়তা বনাম দলীয় সংকট
তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ৬০ শতাংশের ওপরে, যা এলডিপির জনপ্রিয়তার প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় মূলত তাকাইচির ব্যক্তিগত সাফল্য, পুরোপুরি দলীয় নয়। কারণ রাজনৈতিক অর্থায়ন কেলেঙ্কারি ও বয়স্ক নেতৃত্বের আধিপত্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়
ক্ষমতায় এসে তাকাইচি দ্রুত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পদক্ষেপ নেন: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন। তার সরকার জ্বালানির ওপর কর প্রত্যাহার করেছে এবং খাদ্যের ওপর ভোক্তা কর স্থগিত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিদেশিবিরোধী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম কঠোর করার প্রতিশ্রুতি দেন। আবাসনের আবেদনকারীদের জাপানি ভাষা শেখার উৎসাহ দেওয়া এবং সম্পত্তি ক্রেতাদের জাতীয়তা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও আনা হয়েছে। জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে পর্যটকদের সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সামনের চ্যালেঞ্জ
যদিও নিম্নকক্ষে বড় জয় এসেছে, উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদে এলডিপি এখনও সংখ্যালঘু। সংবিধান সংশোধনের মতো বড় পদক্ষেপ নিতে হলে তাকাইচিকে সেখানে সমর্থন জোগাড় করতে হবে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বাড়ানোর প্রশ্নে তাকে সমঝোতার পথে হাঁটতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাপানকে সামরিক ব্যয় বাড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিয়ে তাকাইচির মন্তব্যের পর চীন কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তিনি পার্লামেন্টে বলেছিলেন, চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ চালায়, তবে টোকিও সামরিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করতে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জাপানকে অতীতের ভুল না পুনরাবৃত্তি করে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তাইওয়ান প্রসঙ্গে মন্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন।

আগামীর লক্ষ্য
এই মুহূর্তে তাকাইচি এলডিপির নতুন গতি কাজে লাগাতে চান। তার মতে, জনগণ দলের ওপর আস্থা রেখেছে। তিনি বলেছেন, দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ করবে এবং তিনি নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবেন।
জাপানের রাজনীতিতে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইতিহাস থাকলেও তাকাইচি নিজেকে দীর্ঘস্থায়ী ও রূপান্তরমূলক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে স্থায়ী নীতিগত সাফল্যে রূপ দেওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















