প্রতিবছর বসন্তের আগমনে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জের এক নীরব নদী তীর শিমুলের রঙে লালিমায় সেজে ওঠে। এই সময়টিতে স্থানীয় অর্থনীতি অল্প সময়ের জন্যই হলেও উল্লেখযোগ্য বুস্ট পায়।
জাদুকাটা নদীর তীর তাহিরপুর উপজেলায়, ঢাকা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে, হাজার হাজার শিমুল গাছ ফুলে ভরে ওঠে। ফলে পরিচিত শিমুল বাগান লাল রঙের ছায়ায় মোড়া হয়ে যায়, পাশে মেঘালয়ের নীল পাহাড়ের দৃশ্যকে আরও চোখজড়ানো করে তোলে।
এ বছরের শিমুলের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশটি ফেব্রুয়ারি মাসের পহেলা ফাল্গুন এবং ভ্যালেন্টাইন ডে-এর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় দর্শনার্থীদের আকর্ষণ দ্বিগুণ হয়েছে। সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ আগমন করেন, অনেকে হলুদ, কমলা ও লাল পোশাকে বসন্তের প্রথম দিন উদযাপন করেছেন। নদীর তীর তখন যেন রঙের এক রঙিন মেলা হয়ে উঠেছে।

শিমুল বাগানের ইতিহাস ২০০০ সাল থেকে। তখনকার বড়ঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে প্রায় ৩ হাজার শিমুল গাছ রোপণ করেছিলেন। ধীরে ধীরে এটি দেশীয় পর্যটন মানচিত্রে স্থান পেয়েছে এবং স্থানীয়দের মতে, এটি এশিয়ার অন্যতম বড় শিমুল বাগান।
দুই দশক পেরিয়ে এ মৌসুমি ফুলের ব্যবসায় স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ছোট খাবারের দোকান, রাস্তার চায়ের স্টল, হোটেল এবং নৌকাযোগী ব্যবসায়ীরা ক্রমবর্ধমান পর্যটকের উপস্থিতিতে উল্লসিত। ফুলের ছবি তোলা, ঘোড়ায় চড়া এবং নদীর তীরে বসে সময় কাটানো এখন মানুষের প্রিয় বিনোদন।
ঢাকার এক পর্যটিকা তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বললেন, “ফুলের মাঝে হাঁটা যেন স্বপ্নের মতো। ছবি দেখেছি আগে, কিন্তু বাস্তবে অভিজ্ঞতা কল্পনার বাইরে। তবে ভিড় অনেক বেশি, শান্ত কোন জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।”
এই ভিড় স্থানীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করেছে। নৌকাযোগ্য স্থানগুলোতে দীর্ঘ লাইন, সরু রাস্তা যানবাহনের চাপ সহ্য করতে পারছে না। ট্রাফিক জ্যাম ও জনসমাগম প্রধান অভিযোগের বিষয়। পর্যটক আলী হায়দার বলেন, “স্থানটি অসাধারণ হলেও সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এবং জাদুকাটা নদীর উপর সেতু দ্রুত সম্পন্ন হলে ভ্রমণ আরও সহজ হবে এবং পর্যটক সংখ্যা আরও বাড়বে।”

শীর্ষ সময়ে পর্যটন পুলিশ ও সাদা পোশাকের নিরাপত্তা সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাগানের মালিক রাকিব উদ্দিন জানান, বসন্তের প্রথম দিন থেকেই হাজার হাজার পর্যটক আগমন শুরু করেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে, তবে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন আরও উন্নত রাস্তা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং সুবিধা বাড়ালে বাগানকে একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
তবে, শিমুলের সৌন্দর্য অল্প সময়ের জন্যই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লাল পাপড়িগুলো ঝরে যাবে, ভিড় কমে যাবে এবং বাগান আবার শান্তিতে ফিরবে — নতুন বসন্তের জন্য অপেক্ষা করবে নদীর তীরকে আবারো আগুনের লালিমায় রাঙানোর জন্য।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















