বিশ্বস্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম শীর্ষ নাম আর্থার কোনার্থ জার্মানি ছেড়ে চীনের শেনঝেন উপসাগর গবেষণাগারে পূর্ণকালীন দায়িত্ব নিয়েছেন। গত ২৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ব্রেন প্রাইজপ্রাপ্ত এই গবেষকের চীনে যোগদানকে বৈশ্বিক বিজ্ঞান অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মস্তিষ্ক গবেষণায় যুগান্তকারী অবদান
আর্থার কোনার্থ দীর্ঘদিন ধরে মানব মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে তা বোঝার ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনেছেন। শেখা ও স্মৃতির ভিত্তিগত প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বৈদ্যুতিক সংকেত বিশ্লেষণ, উন্নত চিত্রায়ন প্রযুক্তি এবং কোষভিত্তিক পরীক্ষার সমন্বয়ে তিনি স্নায়ুবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
তিনি ইন ভিট্রো ব্রেন স্লাইস প্যাচ-ক্ল্যাম্প রেকর্ডিং পদ্ধতির পথিকৃৎ। এই পদ্ধতিতে কাচের সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড ব্যবহার করে মস্তিষ্ক কোষের ঝিল্লির একক গেট দিয়ে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক স্রোত পরিমাপ করা হয়। ফলে বিজ্ঞানীরা কোষস্তরে স্নায়ু কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে এটি এখন ভিত্তিমূল পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৯৮৯ সালে বার্ট সাকমান, ফ্রান্সেস এডওয়ার্ডস ও তোমোয়ুকি তাকাহাশির সঙ্গে কাজ করে তিনি এ প্রযুক্তিকে পরীক্ষাগার ধারণা থেকে কার্যকর মানদণ্ডে রূপ দেন। বিচ্ছিন্ন কোষের বদলে মস্তিষ্ক টিস্যুর সংযুক্ত নিউরনে এই পদ্ধতির প্রয়োগ আধুনিক স্লাইস ইলেক্ট্রোফিজিওলজির ভিত্তি গড়ে দেয়।
দ্বি-ফোটন চিত্রায়নে নতুন যুগ
২০০৩ সালে তাঁর দল এমন এক চিত্রায়ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে পুরো স্নায়ুকোষ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম দেখা সম্ভব হয়। ২০১০ সালে তাঁরা আরও এক ধাপ এগিয়ে জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে পৃথক সিন্যাপ্স স্তরে দৃশ্যত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ পর্যবেক্ষণ করেন। শক্তিশালী দ্বি-ফোটন মাইক্রোস্কপি ও বৈদ্যুতিক রেকর্ডিং একত্র করে কোষের ডেনড্রাইটে সংকেত প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। এতে আচরণ নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি বোঝার পথ আরও উন্মুক্ত হয়।
সম্মাননা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আর্থার কোনার্থ পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা। ২০১৫ সালে তিনি ব্রেন প্রাইজ লাভ করেন, যা স্নায়ুবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার হিসেবেও পরিচিত। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখে হার্টি ফাউন্ডেশন সিনিয়র অধ্যাপক পদ, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক গবেষণা পুরস্কার এবং গটফ্রিড উইলহেল্ম লাইবনিজ পুরস্কারও তাঁর অর্জনের তালিকায় রয়েছে।
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখের তৎকালীন সভাপতি উলফগ্যাং হারমান মন্তব্য করেছিলেন, কোনার্থ প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বমানের স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন।

শেনঝেনে নতুন অধ্যায়
১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া কোনার্থ মিউনিখে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিভিন্ন শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। দীর্ঘ একাডেমিক জীবনের পর এবার তিনি চীনের শেনঝেন উপসাগর গবেষণাগারে পূর্ণকালীন দায়িত্ব নিচ্ছেন।
গুয়াংডং প্রদেশের শেনঝেনে অবস্থিত এ গবেষণাগার জীববিজ্ঞান ও জীবতথ্যবিদ্যায় দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ২০২৩ সালে খ্যাতনামা জীববিজ্ঞানী ইয়ান নিং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি শেনঝেনকে স্বপ্নের শহর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আগামী এক থেকে দুই দশকে বৈশ্বিক জৈবচিকিৎসা গবেষণায় শহরটি গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















