বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। নানা আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব।

রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে বর্জ্য সমস্যা
পরিবেশকর্মী লুসেরোর ভাষ্য, নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীদের অঙ্গীকারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুব কমই গুরুত্ব পায়। দুর্যোগ বা কেলেঙ্কারি না ঘটলে এই ইস্যু সাধারণত আলোচনায় আসে না। ফলে নীতিনির্ধারণে এটি কখনও ধারাবাহিক অগ্রাধিকার পায় না।
এই অবহেলার প্রভাব পড়ে বাজেট বণ্টনেও। অধিকাংশ শহর সংগ্রহ ও পরিবহনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, কিন্তু বর্জ্য আলাদা করা, জৈব সার তৈরি বা পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরের বিকৃত প্রণোদনা
লুসেরোর মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোই অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বাড়ায়। কারণ ঠিকাদারদের অনেক সময় সংগ্রহ ও পরিবহনের পরিমাণ অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হয়। যত বেশি ট্রাক, যত বেশি টন বর্জ্য, তত বেশি আয়।
ফলে একটি বিপরীতমুখী প্রণোদনা তৈরি হয়—বর্জ্য কমানো নয়, বরং বেশি পরিবহন করাই লাভজনক হয়ে ওঠে। এদিকে পুনর্ব্যবহার খাত এখনও বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফিলিপাইনে প্রধান প্লাস্টিক রেজিনের মাত্র ২৮ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়, বাকিটা ফেলে দেওয়া হয়।
কম ল্যান্ডফিল ফি এবং দ্বীপভিত্তিক ভূগোল
দেশটিতে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেলার ফি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় পুনরুদ্ধার বা পুনর্ব্যবহার অবকাঠামো গড়ে তোলার চেয়ে সরাসরি ফেলে দেওয়া সস্তা পড়ে। উপরন্তু, ফিলিপাইনের দ্বীপভিত্তিক ভৌগোলিক অবস্থান পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় বাধা সৃষ্টি করে।

উৎপাদন নয়, নিষ্পত্তিকেই মূল সমস্যা হিসেবে দেখা
লেডেসমার মতে, সরকার এখনও বর্জ্যকে মূলত নিষ্পত্তির সমস্যা হিসেবে দেখে, উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে নয়। অর্থাৎ বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর কৌশলের বদলে শেষ ধাপের সমাধানেই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
আইনে একটি ধারা রয়েছে, যার অধীনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের তালিকা প্রকাশের কথা, যার মধ্যে স্যাশে প্যাকেটও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও সেই তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ঝুঁকি
ল্যান্ডফিল ব্যর্থ হলে নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের দিকে ঝোঁকেন। এসব প্রকল্প পরিচ্ছন্ন নিষ্পত্তি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান অবকাঠামো হিসেবে আকর্ষণীয়। ইতিমধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলো মার্কোস প্রশাসনের কাছে এমন প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা, এসব প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে শহরগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ বর্জ্য সরবরাহে বাধ্য করে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত টন বর্জ্য সরবরাহ না করতে পারলে জরিমানা গুনতে হয়।
লেডেসমা এই পদ্ধতিকে ভ্রান্ত সমাধান বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এতে শহরগুলো ঋণের বোঝায় পড়তে পারে এবং বর্জ্য কমানোর পরিবর্তে আরও উৎপাদনে উৎসাহিত হয়।
দীর্ঘদিনের অবহেলার হিসাব
ফিলিপাইনের বর্জ্য সংকট কেবল স্যাশে সংস্কৃতি বা অসচেতন নাগরিকদের কারণে তৈরি হয়নি। এটি এমন এক ভাঙাচোরা ও ল্যান্ডফিলনির্ভর ব্যবস্থার ফল, যা বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ানোকে পুরস্কৃত করে এবং তাৎক্ষণিক সমাধানে নির্ভর করে।
দেশটি জানে কার্যকর মডেল কেমন হওয়া উচিত। আইনেই উল্লেখ আছে—উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, জৈব বর্জ্যের কম্পোস্টিং, শক্তিশালী পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা এবং ল্যান্ডফিল ব্যবহার কেবল অবশিষ্ট বর্জ্যের জন্য সীমিত রাখা।
কিন্তু এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রকৃত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী বক্তৃতায় নয়, নির্বাচনী অঙ্গীকার, বাজেট বরাদ্দ এবং কঠোর প্রয়োগে প্রতিফলিত হবে।
তা না হলে ফিলিপাইনে বর্জ্যের পাহাড় আরও উঁচু হবে। আর প্রতিবারই দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকবে। সেবু দেখিয়েছে, আবর্জনায় মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের ফল নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার মূল্য, যা এখনও নিজের ফেলে দেওয়া বর্জ্যের দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















