রমজান মাসে রোজা শুধু ইবাদতের সূচি নয়, শরীর ও মনকে পুনরায় জীবনযাত্রার ছন্দে ফেরাতে এক শক্তিশালী Reset—এই মতে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, রোজা শরীরের গভীর কারিগরি পরিবর্তন ঘটিয়ে তা ‘ধীর বয়সে’ সহায়তা করতে পারে। শরীর দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়া থাকলে তা প্রতিনিয়ত হজমের কাজ থেকে একটু দূরে সরে যায় এবং নিজেকে মেরামতের দিকে মনোনিবেশ করে, সেই কারণেই রোজা শরীরের ভিতরে সুস্থতা আনতে সাহায্য করে বলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন।
দীর্ঘ বিরতির মাধ্যমে শরীরের রিপেয়ার প্রক্রিয়া
প্রতিদিন দীর্ঘ সময় খাবার না খাওয়ার ফলে শরীরের সাধারণ জাগরণে থাকা হজম প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। তখন শরীর গ্লুকোজ বা চিনি ব্যবহার করা কমিয়ে দেহে জমা থাকা চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে। এ পরিবর্তন একরকম শারীরিক ‘স্প্রিং ক্লিনিং’ এর মতো, যেখানে পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো সরিয়ে ফেলা হয়, প্রদাহ কমে এবং শরীর নতুন করে নিজেকে সাজানোর দিকে মনোনিবেশ করে। চিকিৎসকরা বলছেন এই পরিবর্তন ধীর বয়সী শরীরের অভ্যন্তরীণ সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বয়স প্রদর্শনের বাহ্যিক নয়, অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সূচক
এখানে ‘বয়স ধীর করা’ বলতে শুধুই বাহ্যিক সৌন্দর্য নাহি, বরঞ্চ রক্তে চিনির নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল ভারসাম্য, প্রদাহ হ্রাস, পেশি শক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য, হৃদয় সুস্থতা এবং হরমোনের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা বোঝানো হয়। এই সূচকগুলোই শরীরের অভ্যন্তরীণ বয়সকে ধীর বা দ্রুত করে।
সময়-নির্ধারিত খাওয়া ও রোজার মিল
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোজার রুটিন হচ্ছে ‘সময়-সীমিত খাদ্যগ্রহণ’ বা টাইম-রিসট্রিক্টেড খাওয়ার মতো, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া হয় এবং বাকি সময় শরীর বিশ্রামে থাকে। এই পদ্ধতি রক্তে চিনির নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে— ধারাবাহিকতা তীব্রতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে। খাদ্যের পরিমাণ কম করলেই হয় না, সঠিক সময়ে বিরতি নেওয়াই শরীরের রিপেয়ার মেশিন চালু করে।

হরমোনে ইতিবাচক পরিবর্তন
রোজা শরীরের ইনসুলিন স্তরকে কমিয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি ও বয়স সংক্রান্ত রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। একই সাথে গ্রোথ হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা পেশি শক্তি ও টিস্যু মেরামতে সহায়তা করে। দীর্ঘকালীন প্রদাহ যা বয়স বৃদ্ধির একটি বড় চালিকা শক্তি, রোজা তা কমাতে সাহায্য করে।
রোজা একটিবারের ‘কিউর’ নয়, বরং শরীরকে শুদ্ধ করার সুযোগ
চিকিৎসকরা বলছেন, রোজাকে কেবল একটি নিরাময় ভাবা উচিত নয়, বরং এটি শরীরকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সুযোগ। রোজা শরীরকে আরো সচেতন করে, খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবায় এবং শারীরিক ছন্দের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বাড়ায়। তবে রোজা শুধু স্কিনের উজ্জ্বলতা বা পেশির আকার বাড়াতে সরাসরি কাজ করে না। সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত জলগ্রহণ এবং শক্তি প্রশিক্ষণ ছাড়া অতিরিক্ত রোজা পেশি ক্ষয় করতে পারে, বিশেষত বয়স্কদের ক্ষেত্রে।

প্রতিটি শরীরের জন্য রোজা সমান নয়
প্রতিটি ব্যক্তির জন্য রোজা একইভাবে উপকারী নয়; বয়স, লিঙ্গ, স্ট্রেসের মাত্রা এবং পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য সব কিছুই প্রভাব ফেলে। রোজা যদি শক্তি খেয়ে ফেলে এবং শরীরকে ক্লান্ত করে, তবে তা শরীরের জন্য উপকারী থাকবে না। রোজা একটি টুল, ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নয়।
রমজানের পরে চিকিৎসা লাভ বজায় রাখার উপায়
রমজান শেষ হলে এই সুস্থতার লাভ স্থায়ী রাখতে আগের অভ্যাসে ফিরে না গিয়ে, রাতে দেরি করে খাওয়া পরিহার করা, খাবারের মধ্যেই বিরতি রাখা, মনোযোগ সহকারে খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম দেওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত, রোজা শরীরের এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে— নিজেকে ধীর করে, সতর্ক করে এবং জীবনের ছন্দে ফিরিয়ে আনে। সঠিকভাবে নেওয়া রোজা শরীরকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ও মনকে তীক্ষ্ণ রাখতে সাহায্য করে, এবং তা কেবল একটি সময়ের জন্য নয়, বরঞ্চ দীর্ঘদিনের জন্য স্বাস্থ্যবান জীবনযাপনের সহায়ক হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















