ব্রিটেনে তরুণদের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শুধু মানসিক স্বাস্থ্য, অতিরিক্ত পর্দা-নির্ভরতা বা একাকিত্বকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়—এগুলো মূলত বড় সংকটের লক্ষণ মাত্র। কঠিন বাস্তবতা হলো, দেশটির তরুণ প্রজন্ম প্রায় সব সূচকেই পিছিয়ে পড়ছে এবং দ্রুত কার্যকর পরিবর্তন না এলে একটি পুরো প্রজন্মকে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, তরুণদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দ্রুত বাড়ছে। তারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশের আনন্দের বদলে ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে, কারণ সামনে স্পষ্ট কোনো সুযোগ দেখতে পাচ্ছে না।
বেকারত্বের চাপ সবচেয়ে বেশি তরুণদের ওপর
নতুন তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৫ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে বেশি। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তরুণদের ওপর।
কর বৃদ্ধি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের ফলে প্রাথমিক স্তরের চাকরি কমে যাচ্ছে। নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি খরচে ডিগ্রি নেওয়া অনেক তরুণ শত শত আবেদন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছে না।
১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্ব প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতি আটজন তরুণের একজন কাজহীন, যা ইউরোপীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
নিজের বাড়ির স্বপ্ন এখন প্রায় অসম্ভব
তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্ন এখন অনেকটাই কল্পবিজ্ঞানের মতো। এমনকি চাকরিতে থাকা তরুণদের কাছেও ভাড়া বাসা নেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
আগের প্রজন্মের কাছে ভাড়া বাসা মানে ছিল স্বাধীনতা ও আনন্দের অভিজ্ঞতা। কিন্তু এখন অনেক তরুণের কাছে এটি যেন এক অদ্ভুত কারাগার—নিজস্ব জায়গা থাকলেও সামাজিক জীবন, পোশাক বা ব্যক্তিগত খরচের জন্য অর্থ থাকে না।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় বাড়ছে হতাশা
২৪ বছর বয়সী কিজি নামের এক তরুণী জানান, তার চাকরির বেতন মোটামুটি হলেও জীবন চালানো কঠিন। তিনি বলেন, সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করেও তাকে খাবার আর গরমের খরচের মধ্যে বেছে নিতে হয়।
তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ ১০ বন্ধুর মধ্যে ছয়জন বেকার, একজন খণ্ডকালীন কাজ করেন এবং তিনজন চাকরি করেও বাবা-মায়ের বাড়িতে থাকছেন। তার ভাষায়, তারা সবাই হতাশ এবং নিজেদের ভাগ্যবান বলেই মনে করেন।
সুযোগের অভাবে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা
দিকনির্দেশনা হারানো তরুণরা দ্রুত বিকল্প ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঝুঁকছে। ক্রিপ্টো জুয়া, অনলাইন বাজি, চরমপন্থী প্রভাবক এবং জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।
যখন ভালো চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়া যায় না, তখন হতাশা, রাগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে বাস্তব বন্ধুত্বের জায়গা দখল করছে অনলাইন ও কৃত্রিম সম্পর্ক।

মহামারি-পরবর্তী প্রভাব আরও গভীর
বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির সময় পরীক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দীর্ঘ সময় ঘরে আটকে থাকার প্রভাব এখনো তরুণদের ওপর রয়ে গেছে। পরবর্তী সময়েও তাদের জন্য বড় কোনো সহায়ক নীতি চোখে পড়েনি।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে পরিবারগুলোও আগের মতো সহায়তা করতে পারছে না, ফলে তরুণদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সমাধানে প্রয়োজন বড় নীতিগত পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি বদলাতে অলৌকিক কিছু নয়, বরং বড় নীতিগত পরিবর্তন দরকার। করপোরেট মুনাফার একটি অংশ আইন করে তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের প্রস্তাবও এসেছে।
প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী কর্মঅভিজ্ঞতা ছাড়াই শিক্ষা শেষ করছে এবং কোথায় চাকরি খুঁজবে বা কীভাবে আবেদন করবে—সে ধারণাও নেই। শিল্পখাত ও তরুণদের মধ্যে একটি জাতীয় সেতুবন্ধন তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক বন্ধন ফিরিয়ে আনার তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের জন্য সাশ্রয়ী ক্রীড়া ক্লাব, যুবকেন্দ্র ও সামাজিক আয়োজন বাড়ানো জরুরি। মহামারির পর সামাজিক মেলামেশার অভ্যাস ভেঙে গেছে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে।
তরুণদের বাস্তব জগতের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশাও অবাস্তব হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















