ওয়াশিংটনে কংগ্রেস ভবনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অনুষ্ঠিত দুটি শুনানিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কিন্তু গভীর সন্দেহপূর্ণ অবস্থান। শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা চীনের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চান, তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে না আস্থা। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ তুলেছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে কিংবা সংবেদনশীল প্রযুক্তি হাতিয়ে নিতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে।
আসন্ন শীর্ষ বৈঠক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে ঘিরে এই শুনানিগুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর এটি হবে তার প্রথম চীন সফর।
কংগ্রেসে আলোচনায় বাণিজ্য, উন্নত প্রযুক্তি ও বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ঘিরে দ্বিদলীয় উদ্বেগ সামনে আসে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের আইনপ্রণেতারাই চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

স্থিতিশীল সম্পর্ক, কিন্তু আস্থা নয়
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শুনানিতে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে গঠনমূলক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, কিন্তু সেটি আস্থার সমার্থক নয়। তার ভাষায়, চীন এমন খুব বেশি কারণ দেখায়নি, যার ভিত্তিতে তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়।
প্রযুক্তি পাচার ও চিপ চোরাচালান নিয়ে উদ্বেগ
দিনের দ্বিতীয় শুনানিতে বাণিজ্য দপ্তরের রপ্তানি প্রয়োগ বিভাগের সহকারী সচিব ডেভিড পিটার্স স্বীকার করেন, উন্নতমানের চিপ চোরাচালান হচ্ছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। তবে বিদেশে নজরদারি ও তদন্ত চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়, যা প্রয়োগ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
আইনপ্রণেতারা চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন। বিশেষ করে ডিপসিক নামের একটি এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা সমন্বিতভাবে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ডিপসিকের সর্বশেষ মডেল সম্ভবত এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল চিপ ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির লঙ্ঘন হতে পারে।

মিশিগানের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বিল হুইজেঙ্গা বলেন, ট্রাম্প উন্নত চিপ রপ্তানি নিষিদ্ধ করলেও চীন কোনো না কোনোভাবে সেগুলো সংগ্রহ করছে। তার মতে, চীনের নিজস্ব এআই চিপ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকায় তারা চুরির পথ বেছে নিচ্ছে।
প্যাক্স সিলিকা ও জোট গঠনের উদ্যোগ
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন প্যাক্স সিলিকা নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছে, যার লক্ষ্য এআই-সম্পর্কিত সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করা এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন ঐকমত্য গড়ে তোলা। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ভারত, ইসরায়েল, জাপান, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য এতে সই করেছে। তবে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নেদারল্যান্ডস, তাইওয়ান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা এতে যোগ দেয়নি।
হেলবার্গ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাত ও শিল্পশক্তিই তাদের পররাষ্ট্রনীতির বড় হাতিয়ার। তার দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবে অংশ নিতে বহু দেশ আগ্রহী, আর যুক্তরাষ্ট্র সেই আগ্রহকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার করতে চায়।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও ‘চায়না শক ২.০’
হেলবার্গ চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতাকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিস্তৃত এক লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শুল্কনীতি নেই, তারা নতুন করে ‘চায়না শক ২.০’-এর মুখোমুখি হচ্ছে। চীন সস্তা স্মার্টফোন, টেলিকম সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক যানবাহন বিশ্ববাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, চীন প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিখাতে মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চস্তরে উঠে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত রেখে নিজেদের কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্বে রাখার ব্যবস্থা করা।
ভারতের ভূমিকাও আলোচনায় আসে। হেলবার্গের মতে, মানবসম্পদ ও দক্ষতার গভীরতায় ভারত চীনের সমকক্ষ। ২০ ফেব্রুয়ারি ভারত প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















