ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি দীর্ঘদিন ধরে আদর্শিক আনুগত্য ও বাস্তববাদী রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে আসছেন। তেহরানের পরমাণু নীতি ও কৌশলগত কূটনীতির কেন্দ্রে তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ মুখ। যদিও তিনি সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন না, তবু নীতিনির্ধারণের নেপথ্যে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রভাবশালী।
জেনেভা বৈঠকের নেপথ্যের প্রধান ব্যক্তি
বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা যখন মুখোমুখি হবেন, তখন তেহরানের হয়ে পর্দার আড়ালে প্রধান ভূমিকায় থাকবেন আলী লারিজানি। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের জন্য মস্কোতে তাকে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে।
বিশ্বাসভাজন নেতা হিসেবে উত্থান
৬৮ বছর বয়সী লারিজানি পরিমিতভাষী ও সংযত স্বভাবের জন্য পরিচিত। দীর্ঘ সামরিক, গণমাধ্যম ও আইনসভা অভিজ্ঞতার কারণে তিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত।

২০২৫ সালে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর তাকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় দুই দশক আগে তিনি একই পদে ছিলেন। এ পদে থেকে তিনি প্রতিরক্ষা কৌশল সমন্বয় এবং পরমাণু নীতির তদারকি করেন।
এরপর থেকেই কূটনৈতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা সতর্কভাবে পুনরায় শুরু হয়, তখন তিনি ওমান ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশে সফর করেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি এখন আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয়।
রাজনৈতিক শিকড় ও ব্যক্তিগত পটভূমি
১৯৫৭ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি একজন প্রভাবশালী শিয়া ধর্মীয় পরিবারের সন্তান। তার পিতা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কয়েক দশক ধরে তার পরিবার ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ।
পরিবারের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তারা তা অস্বীকার করেছেন। লারিজানি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ্চাত্য দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্য ছিলেন। পরে ১৯৯৪ সাল থেকে এক দশক রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার সংস্থা পরিচালনা করেন। ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদের স্পিকার ছিলেন।
পরমাণু আলোচনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
১৯৯৬ সালে তাকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে খামেনির প্রতিনিধি করা হয়। পরে তিনি পরিষদের সচিব ও প্রধান পরমাণু আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা পরিচালনা করেন।
২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কাছে পরাজিত হন। পরবর্তীতে পরমাণু কূটনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
তার পুনরায় সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হওয়াকে অনেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির সমর্থক ছিলেন লারিজানি। তবে তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে সেটি ভেঙে যায়।
কঠোর বার্তা ও সতর্ক অবস্থান

২০২৫ সালের মার্চে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ দফা পরমাণু আলোচনার আগে তিনি সতর্ক করেন, দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ ইরানের পরমাণু অবস্থান বদলে দিতে পারে। তার ভাষায়, ইরান পরমাণু অস্ত্রের পথে এগোচ্ছে না, কিন্তু ভুল পদক্ষেপ ইরানকে আত্মরক্ষার জন্য কঠোর সিদ্ধান্তে বাধ্য করতে পারে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা উদ্বেগ আসলে বৃহত্তর সংঘাতের অজুহাত। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে নতুন দাবি তোলাকে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুধুমাত্র পরমাণু ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তিনি ইরানের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম, কারণ এতে ওয়াশিংটনের লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।

নিষেধাজ্ঞা, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক হিসাব
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র তাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে, অভিযোগ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। লারিজানি স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক চাপ বিক্ষোভের কারণ হয়েছে, তবে সহিংসতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রভাব রয়েছে। অনেকে মনে করেন, তিনি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে আগ্রহী। তাই একদিকে রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষা, অন্যদিকে নিজস্ব রাজনৈতিক সম্ভাবনা অক্ষুণ্ণ রাখা—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি এগোচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















