চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে মামলার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী পুরোনো দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়িয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে এবং নিরপরাধদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
মামলার স্রোত ও পরিসংখ্যান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রায় এক থেকে দেড় বছরে সারা দেশে প্রায় ২২ হাজার মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে প্রায় দেড় হাজার মামলা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে প্রায় এক হাজার দুইশ। নাশকতা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। চুরি, দখল ও মারামারিসহ নানা অভিযোগে আরও প্রায় দশ হাজার মামলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
এক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৪৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ২৯ হাজার ৭৭২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষকে। এছাড়া ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এই সময়ে ৮৩৪ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনে হয়েছে ৪১টি মামলা।
সংস্থাটি মনে করছে, নানা সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগ থাকলেও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামগ্রিক মানবাধিকার অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
তদন্ত ও চার্জশিটের অগ্রগতি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মামলার অভিযোগপত্র ইতোমধ্যে দাখিল হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। ২০ শতাংশের কিছু বেশি মামলা এখনও তদন্তাধীন। কিছু মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে অনেককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ও মোবাইল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাদের বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও দাবি পুলিশের।
তবে গণহারে এফআইআরে নাম অন্তর্ভুক্তির প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে কঠোর আইন প্রয়োগ কখনও কখনও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঘটে থাকে, পরে তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
যাচাইয়ের আশ্বাস
নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ৫ আগস্টের পর কিছু মামলায় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিরীহ মানুষকে জড়িয়েছে—এমন অভিযোগ সত্য হতে পারে। এসব মামলা যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















