মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন সামরিক প্রস্তুতির মধ্যেই জেনেভায় আবারও মুখোমুখি বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই পরোক্ষ বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। লক্ষ্য একটাই—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়ানো।
বৈঠককে ঘিরে দুই পক্ষের বক্তব্যে যেমন কূটনৈতিক সংযম দেখা গেছে, তেমনি পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিও পরিস্থিতিকে করেছে স্পর্শকাতর।
জেনেভায় নতুন দফা আলোচনা
ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে তেহরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আলোচনার আগে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তাহলে তা ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো তখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে পৌঁছাতে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট—তারা শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা চায়।
ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে টানাপোড়েন
ইরান জোর দিয়ে বলছে, আলোচনা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মনে করেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া বড় সমস্যা। তবুও তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই জোর দিয়েছেন।
বৈঠক কয়েক ঘণ্টার জন্য স্থগিত হওয়ার আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জানান, দুই পক্ষ নতুন ধারণা নিয়ে অভূতপূর্ব উন্মুক্ততা দেখিয়েছে। বৈঠকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা গেছে।
যুদ্ধের ছায়া ও সামরিক বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের সামরিক সমাবেশ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতি যে কোনো সময় উত্তপ্ত হতে পারে। কাতার, সৌদি আরব, জর্ডানসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যাদের অনেক ঘাঁটিই ইরানের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়।
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পপাল্লার সক্ষমতা এখনো কার্যকর। এতে করে সম্ভাব্য সংঘাতে অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারেও বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান অতীতেও সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে পাল্টা বার্তা দিয়েছে, যদিও তা সীমিত মাত্রায় ছিল। ফলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না চাইলেও তেহরান যে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, সেটি স্পষ্ট।

অভ্যন্তরীণ চাপ ও আন্তর্জাতিক অভিযোগ
ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত এবং সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ইরানকে আগের চেয়ে কিছুটা দুর্বল করেছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। এর মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে ইরানের এক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যা কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে জেনেভার আলোচনা শুধু একটি পারমাণবিক চুক্তির প্রশ্ন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















