বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আগামী দুই বছর শুধু ধীর প্রবৃদ্ধির সময় নয়, বরং আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির বড় পরীক্ষার সময় হতে পারে। জ্বালানি ব্যয়, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, দুর্বল রপ্তানি বাজার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কম রাজস্ব আদায়—সব চাপ একসঙ্গে অর্থনীতিকে সংকুচিত করছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩.৯ শতাংশে নেমে যেতে পারে। আইএমএফের হিসাবে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশ হতে পারে। এডিবির পূর্বাভাস আরও সতর্ক—২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪.৭ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ সব সংস্থার হিসাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় নেই।

চাপের প্রথম ধাক্কা পড়ছে মানুষের আয়ে
মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের সহনসীমার অনেক ওপরে। খাদ্য ও খাদ্য নয়—দুই ধরনের পণ্যের দামই বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, চালের দাম কিছুটা কমলেও মাছ, মাংস, সবজি ও পরিবহন ব্যয় এখনো বাজারকে অস্থির রাখছে। জ্বালানি খরচ বাড়লে এই চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না। ফলে প্রকৃত আয় কমছে, ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে এবং দারিদ্র্য আবার বাড়ছে। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশ হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।
আরও বড় উদ্বেগ হলো, মধ্যপ্রাচ্য সংকট না থাকলে চলতি বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নামতে পারে। এর অর্থ, প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার পথ আটকে যেতে পারে।

রপ্তানি কমলে কারখানায় চাকরির ঝুঁকি বাড়বে
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, অর্থনীতির বড় ভরসা। কিন্তু এই খাতও এখন চাপের মুখে। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল, উৎপাদন ব্যয় বেশি, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে, যা খাতটির দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির বড় অংশ জোগান দিলেও কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম তৈরি করছে। উৎপাদন বাড়লেও চাকরি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে সামনে সময়টা আরও কঠিন হতে পারে।
খাদ্যসংকটের ঝুঁকি আসবে দাম, জ্বালানি ও সরবরাহ থেকে
বাংলাদেশে খাদ্যসংকট মানেই শুধু উৎপাদন ঘাটতি নয়। আগামী দুই বছরে বড় ঝুঁকি হতে পারে খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচ, সার ও জ্বালানির সরবরাহ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে সেচ, পরিবহন, সংরক্ষণ, মাছ-মাংস-ডিম উৎপাদন এবং বাজার সরবরাহ সবকিছুতেই খরচ বাড়বে।
বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়াকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অঞ্চল হিসেবে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলেছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলতে থাকলে প্রবৃদ্ধি কমবে এবং চাকরি তৈরির গতি আরও ধীর হবে।

ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ঘাটতি সংকটকে দীর্ঘ করতে পারে
অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাও কম নয়। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের সক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে কর আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে।
এই তিনটি দুর্বলতা একসঙ্গে থাকলে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি দিতে গেলে বাজেট চাপে পড়ে, ব্যাংক খাত দুর্বল থাকলে শিল্প ঋণ পায় না, আর বিনিয়োগ না হলে নতুন চাকরি তৈরি হয় না।
সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপট কী হতে পারে
সব তথ্য মিলিয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যপট হলো—প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি আটকে যাবে, মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের আশপাশে থাকবে, দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়বে বা স্থির থাকবে, রপ্তানি খাত অস্থির থাকবে এবং শিল্পে নতুন চাকরি তৈরির বদলে ছাঁটাই বা নিয়োগ স্থগিতের প্রবণতা বাড়বে।
এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকির ছবি। দ্রুত সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি বাজারে পুনরুদ্ধার এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সংস্কার বিলম্বিত হলে আগামী দুই বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সংকটের সময়ও হয়ে উঠতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















