জার্মানির হামবুর্গ থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তের কথিত ‘ড্রাগবিরোধী যুদ্ধ’ ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলা মামলায় তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, হাজারো হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। প্রতিরক্ষা পক্ষের বক্তব্য, মামলাটি গুজব, গণমাধ্যমের চাপ, আবেগনির্ভর আবেদন এবং দায়মুক্তির আশ্বাস পাওয়া কথিত হত্যাকারীদের স্বীকারোক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দুতের্তের বিরুদ্ধে বিচার হওয়া উচিত কি না, তা নির্ধারণে এক সপ্তাহব্যাপী শুনানির শেষ দিন ছিল শুক্রবার। দুতের্তে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রতিরক্ষার যুক্তি: প্রমাণে নেই সরাসরি সম্পৃক্ততা
প্রতিরক্ষা দল দুতের্তের চলমান আটকাদেশের বিরোধিতা না করলেও বলেছে, তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই। তাদের দাবি, পুলিশি প্রতিবেদন, গুলির অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ এবং ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে আইনসম্মত অভিযান ও সশস্ত্র সংঘর্ষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দুতের্তের সরাসরি নির্দেশ বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হয় অনুপস্থিত, নয়তো অনুমানভিত্তিক সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল।

দুতের্তের আইনজীবী নিকোলাস কাউফম্যান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ টিকিয়ে রাখতে হলে বিশ্বাসযোগ্য ও সমর্থিত প্রমাণে তাঁর সম্পৃক্ততা দেখাতে হবে। যদি দেখা যায় যে সিদ্ধান্তগুলো ছিল বিকেন্দ্রীভূত এবং ইউনিটভিত্তিক, কোনো কেন্দ্রীয় ‘সাধারণ পরিকল্পনা’ থেকে নয়, তবে পরোক্ষ সহ-অপরাধের আইনি ভিত্তি ভেঙে পড়বে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার যেন অনুমান নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে হয়।
অভিযোগের পরিধি ও সময়সীমা
২০২৫ সালের মার্চ থেকে নেদারল্যান্ডসের হেগে আটক রয়েছেন দুতের্তে। তিনি নিশ্চিতকরণ শুনানিতে অংশ নেননি। বর্তমানে ৪৯টি ঘটনায় ৭৬ জনের মৃত্যু এবং দুটি হত্যাচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের ‘ড্রাগযুদ্ধ’ এবং দাভাও শহরের মেয়র থাকাকালে তথাকথিত ‘দাভাও ডেথ স্কোয়াড’-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ডে তিনি পরোক্ষ সহ-অপরাধী। যদিও ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত তাঁর প্রেসিডেন্টশিপে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, অভিযোগ সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে। ২০১৯ সালে ফিলিপাইন রোম সংবিধি থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এই সময়সীমা শেষ হয়।

অভিযোগপক্ষের পাল্টা যুক্তি
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জুলিয়ান নিকলস সমাপনী বক্তব্যে বলেন, দুতের্তের প্রকাশ্য বক্তব্যই প্রমাণ করে যে তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সাক্ষ্য ও দুতের্তের নিজের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি দাবি করেন, সন্দেহভাজন অপরাধীদের হত্যার একটি সাধারণ পরিকল্পনা ছিল এবং দুতের্তে তা নিয়ে গর্বও করেছেন।
নিকলস বলেন, ‘নিরপেক্ষ করা’ শব্দটি প্রতিরক্ষা পক্ষ নিরপেক্ষ অর্থে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে এটি ‘হত্যা’র প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি আলবুয়েরা, লেইতের সাবেক মেয়র রোলান্ডো এস্পিনোসার ঘটনার কথা তুলে ধরেন। মাদক রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর ২০১৬ সালের নভেম্বরে কারাগারে তিনি নিহত হন। সরকারি তালিকায় তাঁকে হত্যার দিনই ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, গ্রেপ্তারের দিন নয়—এ থেকেই শব্দটির ব্যবহারিক অর্থ স্পষ্ট হয় বলে অভিযোগপক্ষের দাবি।
ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধির বক্তব্য
ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিনিধি গিলবার্ট আন্দ্রেস বলেন, ফিলিপাইনের সাংবিধানিক কাঠামোয় নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশের প্রতি সামাজিকভাবে প্রবল আনুগত্য রয়েছে। তাঁর মতে, দুতের্তে যখন হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে সক্রিয় করেছেন, তখন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পরে তাঁর ভাষণগুলো লক্ষ্যবস্তুদের অমানবিক হিসেবে উপস্থাপন করে হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ
আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রাক-বিচার বিচারকরা যদি এক বা একাধিক অভিযোগ নিশ্চিত করেন, তাহলে মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারের জন্য অন্য কক্ষে যাবে। অভিযোগ নিশ্চিত না হলে অভিযোগপক্ষ অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে নতুন করে শুনানির আবেদন করতে পারবে। বিচারকরা চাইলে আরও প্রমাণের নির্দেশও দিতে পারেন।
আদালতের বাইরে উত্তেজনা
২০২৫ সালের মার্চে দুতের্তের আটকাদেশের সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো সমর্থক হেগে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবে এবার শুনানির সময় উপস্থিত সমর্থকের সংখ্যা ছিল অল্প কয়েক ডজন।
অনলাইনে দুতের্তে সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ দেখা গেছে। সমর্থকদের একটি অংশ দাবি করেছে, হেগে আসা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ব্যয় ফিলিপাইন সরকার বহন করেছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে কয়েকজনকে বিলাসবহুল ব্যাগ হাতে একটি কফি বারে দেখা যায়। উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ করা যে পরিবারগুলোকে অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ দাবি অস্বীকার করেছেন।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক দুতের্তে-বিরোধী নেটওয়ার্ক ‘দুতের্তে পানাগুতিন ইউরোপ’ জানিয়েছে, তারা নেদারল্যান্ডস ও ফিলিপাইনে অবস্থানরত কিছু দুতের্তে সমর্থকের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ আনবে। সংগঠনটি বলেছে, ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে অবিরাম আক্রমণ বন্ধ করতে হবে, কারণ তারা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ভোগান্তি সহ্য করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















