মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঘটনায়। এই হামলার জেরে ইরানের তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। বিশ্ববাজারে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে।
ইরানের তেল উৎপাদন ও অবকাঠামোর চিত্র
ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরান বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় সাড়ে চার শতাংশ জোগান দেয়। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং অতিরিক্ত প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট ও অন্যান্য তরল জ্বালানি উৎপাদন করে।
দেশটির অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোর দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ২৬ লাখ ব্যারেল। গত বছর ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট লাখ বিশ হাজার ব্যারেল জ্বালানি রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসও রয়েছে।

ইরানের তেল উৎপাদনের মূল কেন্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশ। আর গ্যাস ও কনডেনসেট উৎপাদনের বড় অংশ আসে বুশেহর উপকূলবর্তী সাউথ পার্স ক্ষেত্র থেকে। দেশটির প্রায় নব্বই শতাংশ অপরিশোধিত তেল খারগ দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হয়, যা হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। এই প্রণালী যেকোনো সামরিক উত্তেজনায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সৌদি আরবসহ ওপেকের অন্য সদস্যরা অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারে। তবে গত এক বছরে উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে সেই অতিরিক্ত সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমে এসেছে।
ইরানের তেল কেনে কারা
ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা চীনের বেসরকারি শোধনাগারগুলো। যুক্তরাষ্ট্র কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও চীন একতরফা নিষেধাজ্ঞা স্বীকার করে না বলে জানিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনায় কিছুটা হ্রাস দেখা গেছে।

সম্ভাব্য হামলা থেকে মজুত রক্ষা করতে ইরান সমুদ্রে ভাসমান তেলের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রে প্রায় ২০ কোটি ব্যারেল তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় দুই দিনের সমান।
বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে ইরান জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর, তেলের উৎস পরিবর্তন এবং ট্যাংকারের অবস্থান গোপন রাখার মতো কৌশল ব্যবহার করে আসছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ভান্ডার
সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র থেকে ইরান বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে। এই ক্ষেত্রটি বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ভান্ডারের অংশ, যার একাংশ কাতারের নিয়ন্ত্রণে নর্থ ডোম নামে পরিচিত।

নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সাউথ পার্স থেকে উৎপাদিত গ্যাসের অধিকাংশই ইরান অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে ব্যয় করে। সর্বশেষ হিসাবে বছরে প্রায় ২৭৬ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদন হয়েছে, যার ৯৪ শতাংশ দেশেই ব্যবহৃত হয়েছে।
গত বছর ইসরায়েলি হামলায় সাউথ পার্সের কয়েকটি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানা যায়। এই ক্ষেত্রটির মোট মজুত প্রায় ১,৮০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহারযোগ্য গ্যাস, যা তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী চাহিদা প্রায় ১৩ বছর পূরণ করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















