পোখরান, ভারত — উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজস্থানের থর মরুভূমির পোখরান ফায়ারিং রেঞ্জে শুক্রবার বৃহৎ আকাশ শক্তির মহড়ায় নিজেদের যুদ্ধক্ষমতা ও প্রস্তুতির প্রদর্শন করল ভারতীয় বিমানবাহিনী। দিন, সন্ধ্যা ও রাত—তিন পর্বে পরিচালিত এই মহড়ায় নির্ভুল লক্ষ্যভেদ ও সমন্বিত আকাশ অভিযানের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
মহড়ার নাম ছিল ‘বায়ু শক্তি’। বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার কিলোগ্রাম বিস্ফোরকসহ ২৭০টির বেশি অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ও চীন এ মহড়ার ওপর কড়া নজর রাখবে।
কোন কোন যুদ্ধবিমান অংশ নিল
মোট ১৩০টিরও বেশি বিমান অংশ নেয় এই প্রদর্শনীতে। এর মধ্যে ছিল ফ্রান্সে নির্মিত রাফাল ও মিরাজ-২০০০, রুশ উৎসের সুখোই-৩০ এমকেআই ও মিগ-২৯, এবং অ্যাংলো-ফরাসি জাগুয়ার। পাশাপাশি পরিবহন বিমানের মধ্যে ছিল সি-১৩০জে, সি-২৯৫ ও সি-১৭। দেশীয় ধ্রুব উন্নত হালকা হেলিকপ্টার, প্রচণ্ড যুদ্ধ হেলিকপ্টার এবং আকাশ ও স্পাইডার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এই মহড়া গতিশীল ও বাস্তবসম্মত যুদ্ধক্ষেত্রে জটিল সমন্বিত আকাশ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তুলে ধরেছে।
তেজসের অনুপস্থিতি ও বিতর্ক
এর আগে জানানো হয়েছিল দেশীয় হালকা যুদ্ধবিমান তেজসও অংশ নেবে। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে রানওয়ে অতিক্রমের একটি ঘটনার পর পুরো তেজস বহর সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার খবরে এই মহড়ায় বিমানটি দেখা যায়নি। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশীয় এলসিএ প্রকল্পের ওপর নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে তেজসের অনুপস্থিতি বিমানবাহিনীর জন্য কিছুটা ধাক্কা।
পাকিস্তান সীমান্তঘেঁষা পোখরানে প্রতি দুই বছর অন্তর এই প্রদর্শনী হয়। তবে গত মে মাসে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষের পর এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
বার্তা ও প্রস্তুতির ইঙ্গিত
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল রবি কপূর বলেন, এটি মূলত আগুনঝরা শক্তি প্রদর্শন, যেখানে বাস্তব অস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে পূর্বের মহড়ার তুলনায় সক্ষমতার অগ্রগতি দেখানো হয়। তাঁর ভাষায়, এর মাধ্যমে দেশের ভেতর ও বাইরের মহলে প্রস্তুতির বার্তা যায়।
কৌশল বিশ্লেষক রাহুল কে ভোঁসলে বলেন, চীন ও পাকিস্তান এ মহড়ার প্রতিটি ধাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে—পুরো অনুশীলন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো কি না, সেটিও তারা খেয়াল করবে। তাঁর মতে, নিয়মিত কর্মসূচি হলেও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এবারের গুরুত্ব বেশি।
এদিকে ১১ ফেব্রুয়ারির এক ব্রিফিংয়ে বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার মার্শাল নাগেশ কপূর বলেন, এই প্রদর্শনী থেকে কে কী বার্তা নেবে তা সংশ্লিষ্টদের বিষয়; বিমানবাহিনীর কাজ হলো সক্ষমতা প্রদর্শন করা। উইং কমান্ডার অজিত বাসানে জানান, নাগরিকদের সামনে বিমানবাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি তুলে ধরে আস্থা জাগানোই এ মহড়ার লক্ষ্য।
প্রতিরক্ষা বাজেট ও রাফাল কেনার পরিকল্পনা
চীন ও পাকিস্তানের কৌশলগত চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরের জন্য ভারত ৭.৮৫ ট্রিলিয়ন রুপির ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা বাজেট ঘোষণা করেছে। একই সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর সফরের আগে আরও ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবে প্রাথমিক অনুমোদন দেয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালে ৩৬টি রাফাল কেনার চুক্তির পর গত বছর নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি রাফাল-মেরিন কেনার চুক্তিও হয়।
সব মিলিয়ে পোখরানের ‘বায়ু শক্তি’ মহড়া শুধু সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রস্তুতি ও আধুনিকায়নের অগ্রগতিরও স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















