ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও কিয়েভের কৌশল এখন স্পষ্ট—মস্কোকে আলোচনায় আনতে হলে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও লাগাতার চাপ বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যেই চার বছর ধরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন ইউক্রেনের নিষেধাজ্ঞা নীতির কমিশনার ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউক। তার বিশ্বাস, ২০২৫ ছিল রাশিয়ার অর্থনীতিতে ফাটল ধরার বছর, আর ২০২৬ হতে পারে মোড় ঘোরানোর সময়।
কিয়েভে কূটনীতিক বৈঠকে সতর্ক বার্তা
জানুয়ারির মাঝামাঝি কিয়েভের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে প্রায় ত্রিশজন পশ্চিমা রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিককে নিয়ে এক বৈঠকে ভ্লাসিউক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অনেক দেশ এখনো বড় রুশ তেল কোম্পানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। একই সঙ্গে পশ্চিমা তৈরি ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ রুশ অস্ত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে—এ তথ্যও তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য ছিল, রাশিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগ না করলে যুদ্ধ থামানো কঠিন হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক কমিশনার হিসেবে ভ্লাসিউকের কাজ হলো পশ্চিমা মিত্রদের বোঝানো, কেবল অস্ত্র সহায়তা নয়—অর্থনৈতিক অবরোধই মস্কোর যুদ্ধযন্ত্রকে থামাতে পারে।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে ফাটল?
দীর্ঘ সময় ধরে নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করতে পারেনি। সামরিক ব্যয়ের জোরে অর্থনীতি টিকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বছর রাশিয়ার প্রবৃদ্ধি এক শতাংশের নিচে নেমেছে। তেলের রপ্তানি আয়ও ২০২২ সালের পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভ্লাসিউকের মতে, এই লক্ষণগুলোই দেখাচ্ছে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ কিয়েভের সুপারিশের ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছে। তবে সর্বশেষ প্যাকেজ হাঙ্গেরির আপত্তিতে আটকে যায়, যদিও তা পরে পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মূল চ্যালেঞ্জ: ছায়া জাহাজ বহর
রাশিয়া পশ্চিমা মূল্যসীমা এড়াতে ‘ছায়া জাহাজ বহর’ ব্যবহার করছে বলে ইউক্রেনের দাবি। সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এই জাহাজগুলো পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারীদের বাইরে থেকে কাজ করছে এবং অবস্থান তথ্য গোপন করছে। ইউক্রেন প্রথম থেকেই এসব জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানালেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ শুরুতে সতর্ক অবস্থান নেয়।
এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছয় শতাধিক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভ্লাসিউক আরও এক ধাপ এগিয়ে এসব জাহাজ জব্দ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করেছে।
নতুন মোড়ের প্রত্যাশা
ভ্লাসিউকের বিশ্বাস, ২০২৬ সালে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব তুষারধসের মতো বাড়বে। ইউক্রেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রস্তাবিত দ্বিদলীয় বিলের দিকেও তাকিয়ে আছে, যা রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর কঠোর শাস্তির প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
আইনজীবী থেকে নিষেধাজ্ঞা কৌশলবিদ
যুদ্ধের আগে ভ্লাসিউক আইন পেশায় ও সরকারি সংস্কার কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর তিনি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি দলে যুক্ত হন। নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে তিনি কৌশল রপ্ত করেন। সেই দলই প্রথম রুশ জ্বালানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















