দক্ষিণ আইডাহোর ছোট শহর টুইন ফলস বহু বছর ধরে শরণার্থীদের ঘিরে গড়ে তুলেছিল নিজের অর্থনৈতিক ছন্দ। বসনিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কিংবা মিয়ানমারের মতো সংঘাতপীড়িত অঞ্চল থেকে আসা মানুষজন এখানে নতুন জীবন শুরু করেছেন। কারখানায় কাজ, দুগ্ধখামারে শ্রম, গির্জায় সঙ্গীত আর স্কুলে পড়াশোনা—সব মিলিয়ে শহরটির বিকাশে বড় ভূমিকা ছিল এই নতুন বাসিন্দাদের।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁটের পর টুইন ফলস এখন শ্রম সংকটের আশঙ্কায় কাঁপছে।
শরণার্থী নির্ভর অর্থনীতির ভিত
টুইন ফলস ও আশপাশের ম্যাজিক ভ্যালি অঞ্চল আজ কৃষিভিত্তিক শিল্পের শক্ত ঘাঁটি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দই কারখানা চোবানি এখানে কার্যক্রম চালায়। পাশাপাশি রয়েছে বড় খাদ্যপ্রসেসিং প্রতিষ্ঠান, দুধ প্রক্রিয়াজাত কারখানা, পনির ও আলু শিল্প। এই বিস্তৃত শিল্পজাল মূলত পরিশ্রমী শ্রমশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতি বছর ২০০ থেকে ৩৫০ জন শরণার্থী এখানে পুনর্বাসিত হতেন। কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে তারা যুক্তরাষ্ট্রে এসে অস্থায়ী বাসস্থান, কাজের সুযোগ ও শিশুদের স্কুলে ভর্তি সুবিধা পেতেন। কম জীবনযাত্রার খরচ ও তুলনামূলক ভালো মজুরি অনেক পরিবারকে দ্রুত মধ্যবিত্তে উন্নীত হতে সাহায্য করেছে। তাদের সন্তানদের অনেকে এখন কলেজ শিক্ষার্থী কিংবা পেশাজীবী।
শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, শরণার্থীরা সংখ্যায় কম হলেও শহরের সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নীতিগত পরিবর্তনে ধাক্কা
নতুন প্রশাসন শরণার্থী কর্মসূচি স্থগিত করে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ২০২৬ সালের জন্য মাত্র সাড়ে সাত হাজার শরণার্থী গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এর বড় অংশই দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানার জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত।
এই সিদ্ধান্তের ফলে টুইন ফলসে গত মে মাস থেকে মাত্র ৩৭ জন শরণার্থী এসে পৌঁছেছেন, যাদের সবাই আফ্রিকানার। আগে যেখানে বছরে শতাধিক নতুন শ্রমিক যুক্ত হতেন, সেখানে এখন সেই ধারায় বড় ছেদ পড়েছে।
শিল্প সম্প্রসারণ বনাম শ্রম ঘাটতি
এদিকে খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রসারণে ব্যস্ত। চোবানির কয়েকশো কোটি ডলারের সম্প্রসারণ প্রকল্প ২০২৬ সালে চালু হওয়ার কথা। আইডাহো মিল্ক প্রোডাক্টসও নতুন কারখানা চালু করতে যাচ্ছে। অথচ বেকারত্বের হার সাড়ে তিন শতাংশের কাছাকাছি থাকায় স্থানীয় শ্রমবাজার ইতিমধ্যেই টানটান।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, শরণার্থী প্রবাহ কমে গেলে উৎপাদন ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থমকে যেতে পারে। তাদের ভাষায়, বহু কঠিন ও কম আকর্ষণীয় কাজ শরণার্থীরাই গ্রহণ করতেন, যা স্থানীয়দের অনেকেই করতে চান না।

উত্তেজনার অতীত ও বর্তমান
২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারের সময় একটি বিকৃত তথ্যভিত্তিক অপরাধকাহিনি ঘিরে শহরে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। বাইরের উগ্র গোষ্ঠী এসে শরণার্থী বিরোধী বিক্ষোভও করে। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দেয়। সময়ের সঙ্গে উত্তেজনা স্তিমিত হয়।
বর্তমানে উত্তেজনা সরাসরি রাস্তায় নয়, বরং নীতির স্তরে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক। রাজনৈতিক পরিবেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
একটি পরিবারের গল্প
কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে সংঘাত এড়িয়ে আসা স্যামুয়েল এনজাপালাহা ও তাঁর স্ত্রী জোসেফিন মিরিন্ডি ২০১৬ সালে টুইন ফলসে পা রাখেন। শুরুতে দুজনেই একাধিক কাজে যুক্ত ছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে তারা বাড়ি কিনেছেন, সন্তানরা পড়াশোনা ও কাজ করছে। আজ তারা শহরের অর্থনীতির অংশ।
তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, সুযোগ পেলে শরণার্থীরা কেবল সহায়তা নেয় না, বরং অবদানও রাখে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
স্থানীয় প্রাক্তন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, শরণার্থী প্রবাহ বন্ধ হলে টুইন ফলসের অর্থনীতি স্থবির হতে পারে। দুগ্ধখামার থেকে রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই শরণার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অল্পসংখ্যক নতুন আগত আফ্রিকানার দিয়ে এই বিশাল শ্রম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। ফলে শহরটির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—শরণার্থী কমে গেলে টুইন ফলসের প্রবৃদ্ধির গতি কি থেমে যাবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















