চার দীর্ঘ বছর ধরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে যে যুদ্ধ চলছে, তা ইতিহাসের প্রচলিত কোনও ছকে সহজে ফেলা যায় না। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নয়, আবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও নয়। এটি এক নতুন ধরনের ক্ষয়যুদ্ধ, যেখানে ড্রোন কখনও কখনও সামনের সারির সৈন্যদের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, আর যুদ্ধের ‘ফ্রন্টলাইন’ ধারণাটিই বদলে যাচ্ছে।
ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি, তবু অচলাবস্থা
চার বছরে রাশিয়ার বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লক্ষাধিক সৈন্য নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি সংখ্যায় কম হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা গভীর প্রভাব ফেলেছে। তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত।
তবু এত প্রাণহানি সত্ত্বেও যুদ্ধের চরিত্র গত দুই বছরে মূলত অবস্থানগত ও ক্ষয়ধর্মী হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার কাছে জনবল ও অস্ত্রের তুলনামূলক সুবিধা থাকলেও তারা বড় ধরনের কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউক্রেন সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রযুক্তি ও কৌশলে মানিয়ে নিয়ে রাশিয়ার অগ্রযাত্রাকে ধীর করেছে।

ড্রোনযুদ্ধ ও নতুন কৌশল
বর্তমান যুদ্ধে ড্রোনই বড় নিয়ামক শক্তি। সামনের সারির প্রায় বিশ কিলোমিটার এলাকাকে দুই পক্ষই বলছে ‘কিল জোন’। যে পক্ষ এই অঞ্চলে ড্রোনে প্রাধান্য পায়, তারাই মাটিতে বাড়তি সুবিধা নেয়।
রাশিয়া ছোট ছোট পদাতিক দল ব্যবহার করে অনুপ্রবেশ কৌশল নিয়েছে। কখনও মোটরসাইকেল বা হালকা যান ব্যবহার করে দ্রুত পেছনে ঢোকার চেষ্টা করছে। এতে সরঞ্জাম কিছুটা বাঁচলেও মানবক্ষয় বাড়ছে। ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনীয় লাইনের ফাঁক খুঁজে ঢুকে পড়া এখন রাশিয়ার প্রধান কৌশল।
অন্যদিকে ইউক্রেন ড্রোন ইউনিট সম্প্রসারণ করে এবং মাইনফিল্ড ও গোলন্দাজ হামলার সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা গভীর করছে। কিন্তু তাদেরও বড় সমস্যা জনবল ও রিজার্ভ ঘাটতি। অনেক ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে রোটেশন ছাড়াই যুদ্ধ করছে, ফলে ক্লান্তি স্পষ্ট।
সময়ের ঘড়ি কার পক্ষে?
অনেকের ধারণা, সময় যেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষণে চিত্রটি এত সরল নয়। রাশিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেও সেই অগ্রযাত্রা ব্যয়বহুল এবং টেকসই কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।

২০২৫ সালে রাশিয়ার নিয়োগ হার প্রায় তাদের অপূরণীয় ক্ষতির সমান ছিল। অর্থাৎ নতুন সৈন্য সংগ্রহ করেই কেবল ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া গেছে। ২০২৬ সালে এই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে স্থবিরতা, বাজেট ঘাটতি ও কম তেলের দাম চাপ বাড়াচ্ছে।
রাশিয়ার রাজনৈতিক লক্ষ্য, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের বাকি অংশ দখল, অর্জন করতে আরও সময় লাগতে পারে। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইউক্রেনের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
ইউক্রেনের দুর্বলতা স্পষ্ট—জনবল সংকট, ক্লান্ত সেনা, পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরতা। তবু তাদের একটি বড় সুবিধা রয়েছে: তারা প্রতিরক্ষায় রয়েছে। নিজ ভূখণ্ড রক্ষার লড়াইয়ে মনোবল এখনো টিকে আছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক অর্থসহায়তা অনুমোদন করায় অন্তত এক থেকে দুই বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক ভিত্তি রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সমর্থন কতটা স্থিতিশীল থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

পুতিনের হিসাব ও বাস্তবতা
মস্কো এখনো সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দাবি তুলছে, যেন তারা নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে। কিন্তু সামরিক ফলাফল সেই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়ার নেতৃত্ব বিশ্বাস করে পশ্চিমা জোট ভেঙে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে তারা টিকে থাকবে। এখনো সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘সাংক কস্ট’ মানসিকতা কাজ করছে—অর্থাৎ এত বিনিয়োগের পর হঠাৎ পিছু হটা কঠিন। রাশিয়ার অর্থনীতি ও ক্ষমতাকাঠামোও যুদ্ধমুখী বাস্তবতায় মানিয়ে নিয়েছে, ফলে ভেতর থেকে যুদ্ধ থামানোর চাপ কম।
সামনে কী?
২০২৬ সাল একটি মোড় ঘোরানোর বছর হতে পারে। বড় ধরনের সাফল্য কারও হাতেই সহজে আসছে না। এই যুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ‘অলৌকিক সমাধান’ নেই। বরং ক্ষয়, ধৈর্য ও সময়—এই তিন উপাদানই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ।
তবে সাম্প্রতিক সামরিক ও অর্থনৈতিক সূচক বলছে, সময় হয়তো একতরফাভাবে রাশিয়ার পক্ষে নেই। আর যতদিন ইউক্রেন পশ্চিমা সহায়তা ধরে রাখতে পারবে, ততদিন তাদের গ্রহণযোগ্য শর্তে যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















