দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের নির্মম হত্যাযজ্ঞে শুধু সেনা বা উচ্চপদস্থ নেতারাই নয়, জড়িয়ে ছিলেন সমাজের নানা পেশার মানুষও। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বই বাঁধাইকারক ও কাগজ সংস্কারকারীর মতো পেশাজীবীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ইহুদি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তালিকা তৈরির কাজে।
পুরোনো নথি থেকেই তৈরি হয় মৃত্যুর তালিকা
১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষের বংশপরিচয় যাচাই করে তথাকথিত ‘জাতিগত শুদ্ধতা’ নির্ধারণ করা। কিন্তু শত শত বছরের পুরোনো গির্জা, উপাসনালয় ও নাগরিক নিবন্ধনের নথি তখন অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত ও অপাঠ্য ছিল।
গবেষণায় জানা গেছে, পেশাদার সংস্কারকদের দিয়ে এসব নথি পরিষ্কার ও পাঠযোগ্য করে তোলা হয়। জন্ম, বাপ্তিস্ম, বিবাহ ও মৃত্যুর তথ্য সংবলিত এসব কাগজপত্র থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের পারিবারিক ইতিহাস উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সেই তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে নাৎসি প্রশাসন।

দুই দশকের অনুসন্ধানে নতুন বই
সংরক্ষণ ইতিহাসের গবেষক মোরভেনা ব্লুয়েট দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর সাম্প্রতিক গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণের মতো আপাত নিরীহ পেশাকে নাৎসি শাসন কৌশলে ব্যবহার করেছিল।
তিনি জানান, অনেক সংস্কারকই জানতেন যে তারা যে নথি উদ্ধার করছেন, তা মানুষের বংশপরিচয় প্রমাণের কাজে ব্যবহৃত হবে। সে সময় বহু মানুষ গির্জায় গিয়ে নিজেদের ইহুদি নন প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন এবং তথাকথিত আর্য পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতেন।
সংরক্ষণ নয়, তথ্য উদ্ধারই ছিল লক্ষ্য
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নথি সংস্কারের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মূল দলিলের অখণ্ডতা রক্ষা করা হয়নি। বরং যত দ্রুত সম্ভব তথ্য উদ্ধারই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। এই পদ্ধতি পেশার মৌলিক নীতির পরিপন্থী হলেও প্রশাসনিক চাহিদাই তখন অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

নথি পাঠযোগ্য হওয়ার পর সেগুলো সংগ্রহ ও আলোকচিত্রে ধারণ করা হতো। পরবর্তীতে তথ্য বিভিন্ন নাৎসি দপ্তরে পাঠানো হতো। এভাবেই গড়ে ওঠে বিশাল তথ্যভাণ্ডার, যা পরিণত হয় নিপীড়ন ও হত্যার অস্ত্রে।
মতাদর্শের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো
ইতিহাসবিদদের মতে, হলোকাস্ট কেবল উগ্র মতাদর্শের ফল ছিল না, বরং ছিল একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। বহু সাধারণ পেশাজীবী নিজেদের অবস্থান ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে নাৎসি ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করেছিলেন। এই দীর্ঘ প্রকল্পটি ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, যা নাৎসি শাসনের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি।
গবেষকের ভাষায়, গণহত্যার পথে অগ্রযাত্রা কখনও এক লাফে ঘটে না। তা ধাপে ধাপে এগোয় এবং সমাজের নানা স্তরের সহযোগিতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। স্টুডিওতে বসে একটি পুরোনো নথি সংস্কার করার কাজও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে—এই গবেষণা সেই অস্বস্তিকর সত্যই সামনে এনেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















