পবিত্র রমজান শুরু হতেই রোজা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মহলে। জাপানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর ইয়োশিনোরি ওহসুমির গবেষণা বলছে, রোজা রাখলে শরীর নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত কোষ খেতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার নাম অটোফেজি, যার অর্থ ‘স্বয়ংভোজন’। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়াই দেহকে নতুন করে পুনর্গঠন করে, প্রদাহ কমায় এবং দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করতে পারে।
রোজা ও অটোফেজির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
প্রফেসর ওহসুমি ইস্ট কোষ নিয়ে গবেষণা করে আবিষ্কার করেন, খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে কোষের ভেতরে জমে থাকা নষ্ট প্রোটিন, অপ্রয়োজনীয় অংশ ও বর্জ্য পদার্থ ভেঙে পুনরায় শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। এই অটোফেজি প্রক্রিয়ার জন্যই তিনি ২০১৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় না খেলে শরীর গ্লুকোজ পোড়ানো বন্ধ করে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি নিতে শুরু করে। এই পরিবর্তনই কোষ মেরামত প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। এতে প্রদাহ কমে, কোষের কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং বার্ধক্যের প্রভাব ধীর হতে পারে।
মানব বিবর্তন ও রোজার সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি যুগের আগে মানুষ নিয়মিত খাদ্য পেত না। শিকার ও সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল জীবনযাপনে অনাহার ছিল স্বাভাবিক। সেই পরিবেশেই মানুষের দেহ এমনভাবে অভিযোজিত হয়েছে যে খাদ্য না পেলেও টিকে থাকতে পারে। রোজা সেই প্রাচীন জৈব প্রক্রিয়াকেই আবার সক্রিয় করে।

আধুনিক জীবনযাপন ও বিপরীত চিত্র
বর্তমান সময়ে সারাক্ষণ খাওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার, দীর্ঘ সময় জেগে থাকা এবং স্থবির জীবনযাপন স্থূলতা, টাইপ দুই ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত বিরতিহীন খাওয়া শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে। রোজা সেই ক্ষতিকর প্রদাহ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা ও বিরতিহীন উপবাস ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, রক্তে শর্করা কমায়, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হ্রাস করে। এটি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা উন্নত করা এবং আলঝেইমার ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।
অটোফেজি কোষের ভেতরের বর্জ্য পরিষ্কার করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যও উন্নত হতে পারে। গবেষকরা বলছেন, এই সব মিলিয়ে রোজা দীর্ঘায়ুতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোন পদ্ধতিতে বেশি উপকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণের পদ্ধতি নতুনদের জন্য উপযোগী। ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টার মধ্যে অটোফেজি সক্রিয় হতে শুরু করে। আরও দীর্ঘ সময় উপবাসে কোষ পুনর্গঠন বাড়তে পারে, তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে উপবাসের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রোজা তাই শুধু আত্মশুদ্ধির নয়, দেহের গভীর পুনর্গঠনেরও একটি প্রাকৃতিক উপায় হতে পারে— এমনটাই বলছে আধুনিক বিজ্ঞান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















