ভারতের রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুরের প্রাচীন প্রাচীরঘেরা শহর একদিকে ঐতিহ্যের অনন্য ভান্ডার, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার শিকার। ২০১৯ সালে ইউনেসকো এই শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্য মর্যাদা দিলেও এখন সেই স্বীকৃতি টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ সংরক্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে এই মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে জয়পুর।
ঐতিহ্যের শব্দমালা ও হাভেলির বিলুপ্তি
পুরনো শহরে প্রবেশ করলেই ভেসে আসে পুরোনো ছাপাখানার টকটক শব্দ, আবার অন্য গলিতে শোনা যায় মার্বেলের মূর্তিতে ছেনির আঘাত। প্রতিটি পাড়া ঐতিহ্যবাহী পেশাভিত্তিক সম্প্রদায়ের ছন্দে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ধ্বংসের শব্দ—ভেঙে ফেলা হচ্ছে বহু প্রাচীন হাভেলি বা ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদসদৃশ বাড়ি।

১৯৯১ সালে যেখানে প্রায় ১,২০০টি হাভেলি ছিল, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০-তে। বাকিগুলো হয় ভেঙে ফেলা হয়েছে, নয়তো এমনভাবে আধুনিকীকরণ করা হয়েছে যে তাদের ঐতিহাসিক রূপ আর চেনা যায় না। দুর্নীতি, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অর্থাভাব—এই তিন কারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণে বড় ধাক্কা লেগেছে।
‘জয়পুর পিঙ্ক’-এর সুর নষ্ট
১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সফর উপলক্ষে মহারাজা রাম সিং পুরো শহরকে টেরাকোটার বিশেষ গোলাপি রঙে রাঙান। তখন থেকেই ‘জয়পুর পিঙ্ক’ শহরের পরিচয় হয়ে ওঠে। অন্য রঙ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাও জারি ছিল।
কিন্তু দূষণ, এলোমেলো রঙ করা এবং নিয়ম না মানার ফলে শহরের ঐক্যবদ্ধ রঙের সামঞ্জস্য ভেঙে পড়েছে। অনেক জায়গায় এমন রঙ ব্যবহার হয়েছে, যা ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে মেলে না—কখনও তা বিপজ্জনকভাবে কমলার কাছাকাছি চলে গেছে। ফলে শহরের ঐতিহ্যবাহী চেহারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর সংকট
![]()
পুরনো শহরটি নির্মিত হয়েছিল বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ মানুষের জন্য। অথচ এখন সেখানে ৬ লক্ষের বেশি মানুষ বাস করেন। সরু গলিতে জমে থাকা পচা আবর্জনা, ঝুলে থাকা তারের জট এবং খোলা নর্দমার দুর্গন্ধ—এসবই নিত্যদিনের বাস্তবতা।
এ অবস্থায় ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি অনেকের কাছে বিলাসিতা বা অভিজাতদের চিন্তা বলে মনে হতে পারে। উপরন্তু, বিশ্ব ঐতিহ্য মর্যাদা সম্মান এনে দিলেও সরাসরি অর্থসাহায্য দেয় না। ফলে বাস্তব সমস্যার ভিড়ে সংরক্ষণ প্রশ্নটি প্রায়ই পেছনে পড়ে যায়।
ইউনেসকোর আল্টিমেটাম: সংকট নাকি সুযোগ
তবে ইউনেসকোর কড়া সতর্কবার্তা হয়তো জয়পুরের জন্য আশীর্বাদও হতে পারে। যদি শহরটি ‘ঝুঁকিতে থাকা ঐতিহ্য’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে জাতিসংঘের জরুরি তহবিল দ্রুত পাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে।

আর যদি সত্যিই বিশ্ব ঐতিহ্য মর্যাদা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে প্রশাসন হয়তো ঐতিহ্য সংরক্ষণবিষয়ক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে বাধ্য হবে। হাভেলির মালিকদের সঙ্গেও খোলামেলা আলোচনা করে সেগুলোকে ঐতিহ্যবাহী হোটেলে রূপান্তরের মতো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পথে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, মালিকরাও লাভবান হবেন।
রাজনীতিকরা হয়তো সঠিক গোলাপি রঙ ব্যবহারে খুব আগ্রহী নন। কিন্তু বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা যে সম্মান ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়, তা হারাতে তারা নিশ্চয়ই চাইবেন না।
জয়পুরের প্রাচীরঘেরা শহর শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য। হাভেলির পতন, রঙের বিকৃতি এবং অবকাঠামোগত সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—ইউনেসকোর সতর্কবার্তা কি প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করবে? নাকি জয়পুরও হারাবে তার বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















