প্রবৃদ্ধির তুলনায় দুই মহাদেশ
ইউরোপের অর্থনীতিবিদেরা প্রায়ই আটলান্টিকের ওপারের যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঈর্ষাভরে তাকান। শুল্ক অস্থিরতা ও অভিবাসন কমে যাওয়ার মতো সমস্যার পরও যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে ১.৮ শতাংশ। সেখানে ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ শতাংশ।
আমেরিকার তুলনায় ইউরোপের দুর্বলতা স্পষ্ট। ইউরোপে পণ্য ও বিশেষ করে সেবার ক্ষেত্রে একীভূত বাজারের অভাব রয়েছে। সস্তা জ্বালানি নেই, কর তুলনামূলক বেশি এবং কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ে নমনীয়তা কম। নীতিনির্ধারকেরা এ বাস্তবতা জানেন। মারিও দ্রাঘির ইউরোপের নিম্ন প্রবৃদ্ধি নিয়ে করা আলোচিত প্রতিবেদনে ৭০ বারেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে, যা ইউরোপের জন্য সুখকর নয়।

রাজ্যগুলো কি ভুল পথে হাঁটছে?
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো কি নিজেদের শক্তির উৎস ভুলে যাচ্ছে? ফেডারেল পর্যায়ে ট্রাম্প প্রশাসন যখন নিয়ন্ত্রণ শিথিল করছে, তখন অনেক অঙ্গরাজ্য অর্থনৈতিক নীতিতে ইউরোপীয় ধাঁচের দিকে ঝুঁকছে। সব পদক্ষেপই যে নেতিবাচক, তা নয়। তবে অতিরিক্ত খণ্ডীকরণ ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পথে হাঁটলে তা ইউরোপের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
প্রযুক্তি ও বাজারে বিভক্ত নীতি
নতুন প্রযুক্তি ও উদীয়মান বাজারের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর নীতিতে ইউরোপীয় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেস এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কোনো সমন্বিত আইন পাস করতে পারেনি। কিন্তু পাঁচটি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব ও পরস্পরবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে, আরও ১৬টি একই পথে এগোচ্ছে।
স্বচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উত্তর ডাকোটা ও উত্তর ক্যারোলাইনাসহ আটটি অঙ্গরাজ্যে এসব গাড়ি চলাচল করতে পারে। কিন্তু সেগুলো প্রতিবেশী দক্ষিণ ডাকোটা বা দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ঢুকতে পারে না। ফলে প্রযুক্তির বিস্তারেও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

অ্যান্টিট্রাস্ট আইন প্রয়োগেও ভাঙন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যখন হিউলেট প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজ ও জুনিপার নেটওয়ার্কসের মতো বড় করপোরেট সংযুক্তিকে অনুমোদন দিচ্ছে, তখন ক্যালিফোর্নিয়ার নেতৃত্বে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল সেই চুক্তি তদন্ত করছেন। একইভাবে কিছু রাজ্য ভোক্তা ঋণ ও জুয়া খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিলের বিরোধিতা করছে।
কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে ঝোঁক
অন্যদিকে, অনেক অঙ্গরাজ্য ইউরোপীয় ধাঁচে করভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলছে। মাতৃত্ব বা পিতৃত্বকালীন বেতনসহ ছুটির বিষয়টি ইউরোপে স্বাভাবিক হলেও যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন তা অনুপস্থিত ছিল।
গত পাঁচ বছরে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এখন দ্বিগুণ সংখ্যক অঙ্গরাজ্য নিয়োগকর্তাদের জন্য বেতনসহ পারিবারিক ছুটি বাধ্যতামূলক করেছে। প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ আমেরিকান, অর্থাৎ দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ, এমন অঙ্গরাজ্যে বাস করেন যেখানে অন্তত ১২ সপ্তাহের বেতনসহ পারিবারিক ছুটি নিশ্চিত। অনেক স্থানে নতুন মায়েদের জন্য ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত ছুটি পাওয়া যায়।

এসব কর্মসূচি বেশ উদার। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় পুরো হারানো আয়ই প্রতিস্থাপন করা হয়। নিউ জার্সি ও নিউ ইয়র্কের নীতি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সমপর্যায়ের উদার বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই সুবিধার মূল্যও আছে। উচ্চ করের মাধ্যমে এসব কর্মসূচির অর্থ জোগানো হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের তুলনামূলক বেশি কর দিতে হয়।
ভারসাম্যের প্রয়োজন
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একীভূত বাজার, কম কর, সস্তা জ্বালানি ও শ্রমবাজারের নমনীয়তার কারণে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল। কিন্তু অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বিচ্ছিন্ন নীতি, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে ভিন্নতা এবং কল্যাণ ব্যয়ের বিস্তার সেই সুবিধাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখায়, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও খণ্ডীকরণ প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা, কিন্তু এমনভাবে যাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















