প্রবৃদ্ধির প্রতীক নাকি ঝুঁকির শুরু
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটেনের লেবার সরকার হিথ্রো বিমানবন্দরে তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়। লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতি সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরা। কিন্তু বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঘোষণা যত সহজ, বাস্তবায়ন তত কঠিন। এরপর থেকেই ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পটি একের পর এক সতর্ক সংকেতের মুখে পড়ছে।
ব্যয়ের লাগামছাড়া বৃদ্ধি
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ ক্রমবর্ধমান ব্যয়। অকল্যান্ডের পর যাত্রীদের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যয়বহুল বড় বিমানবন্দর ইতিমধ্যেই হিথ্রো। এর পরিচালনাকারী সংস্থা হিথ্রো এয়ারপোর্ট লিমিটেড ৪৯ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের প্রস্তাব দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে হবে বলে জানানো হয়েছে। তুলনায় দুবাইয়ের নতুন হাবে চারটি অতিরিক্ত রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার ব্যয় এর প্রায় অর্ধেক।

এই বিপুল ব্যয়ের ফলে অবতরণ ফি দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে যাত্রীরা অন্য বিমানবন্দর বেছে নিতে পারেন। প্রকল্পটি এমন সব সমস্যার মুখে পড়ছে, যা ব্রিটেনের উচ্চগতির রেল প্রকল্প হাই স্পিড ২–এর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। লন্ডন থেকে বার্মিংহাম পর্যন্ত এই রেললাইন এক দশকের বেশি দেরি হয়েছে, প্রকল্পের পরিসর কমানো হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার জটিলতা
হাই স্পিড ২ প্রকল্প দেখিয়েছে কীভাবে পরিকল্পনা প্রক্রিয়া জটিল হলে ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ে। সংসদীয় অনুমোদন পেতে তিন বছরের বেশি সময় লেগেছিল, পরে স্থানীয় সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আরও আট হাজারের বেশি অনুমতির প্রয়োজন হয়। হিথ্রোর ক্ষেত্রে লেবার সরকার কিছু আইনি চ্যালেঞ্জ সীমিত করলেও অতিরিক্ত পরামর্শ, কাগজপত্র ও আইনি প্রক্রিয়া ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু পরিকল্পনা সংক্রান্ত কাগজপত্রেই এক বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ হতে পারে।
অস্পষ্ট লক্ষ্য ও ভুল প্রণোদনা
হাই স্পিড ২–এর আরেক বড় সমস্যা ছিল লক্ষ্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা। মূল উদ্দেশ্য ছিল রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো, কিন্তু পরে তা গতির ওপর কেন্দ্রীভূত হয়। সরকারের বাণিজ্যিক দক্ষতার ঘাটতি ছিল, আর ঠিকাদারদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের তেমন প্রণোদনা ছিল না।

হিথ্রোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। হিথ্রো এয়ারপোর্ট লিমিটেডের প্রস্তাবে ব্যয় সংযমের কোনো লক্ষণ নেই। যেমন, শুধু গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যই ১.৩ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ রাখা হয়েছে, নতুন টার্মিনালের নকশাও অত্যন্ত জটিল। সংস্থাটির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যৌক্তিক, কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের যে মুনাফা অনুমোদন করে, তা বিনিয়োগের পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ বেশি বিনিয়োগ মানেই বেশি আয়। কিন্তু সরকার কার্যকরভাবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
প্রকল্প বাতিল নয়, কড়া তদারকি প্রয়োজন
সবকিছু বিবেচনায় প্রকল্পটি বাতিল করা সহজ সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু তা ভুল হবে। উন্মুক্ত দ্বীপ অর্থনীতি হিসেবে ব্রিটেনের বৈশ্বিক সংযোগ রক্ষা ও সম্প্রসারণে নতুন রানওয়ে জরুরি। হিথ্রো ইতিমধ্যেই ইউরোপের অন্যতম ভিড়পূর্ণ বিমানবন্দর। পদক্ষেপ না নিলে লন্ডনের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
তাই সরকারের উচিত আরও দৃঢ় হওয়া। প্রথমত, পরিকল্পনা প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। জরুরি আইন এনে পূর্ণ পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে, যাতে অতিরিক্ত অনুমতি ও দীর্ঘ পরামর্শ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন না থাকে। সঠিকভাবে করা গেলে এটি ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।
স্বাধীন নকশা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব

সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রকল্পের নকশা নিয়ন্ত্রণ হিথ্রো এয়ারপোর্ট লিমিটেডের কাছ থেকে সরিয়ে একটি স্বাধীন সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া, যার অতিরিক্ত ব্যয়ে আর্থিক স্বার্থ থাকবে না। সেই সংস্থা প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কাজের জন্য হিথ্রোকে নিয়োগ দিতে পারে, তবে কেবল তখনই যখন তা সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।
হিথ্রো কর্তৃপক্ষ বিলম্বের আশঙ্কা দেখাতে পারে। কিন্তু সরকারের উচিত দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং ন্যাশনাল গ্রিডের মতো একটি স্বতন্ত্র পরিকল্পনা কাঠামো গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রের দৃঢ় ভূমিকার প্রয়োজন
বড় অবকাঠামো নির্মাণ শুধু বেসরকারি খাতকে স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয় নয়। যখন কোনো সংস্থা একচেটিয়া অবস্থানে থাকে, যেমন হিথ্রো বিমানবন্দরে হিথ্রো এয়ারপোর্ট লিমিটেড বা বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ন্যাশনাল গ্রিড, তখন রাষ্ট্রকে কঠোর ও বাণিজ্যিকভাবে দক্ষ অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হয়।
এই দৃঢ়তা না থাকলে ব্রিটেনের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ হবে না এবং ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। হিথ্রোর তৃতীয় রানওয়ে এখন সেই পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















