২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের এক ঐতিহাসিক রায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতায় বড় বাধা তৈরি করেছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই রায় হয়তো আমেরিকার বাণিজ্য নীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং ভবিষ্যতে হঠাৎ করে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি কমবে। কিন্তু সেই আশা খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে।
আইইইপিএ আইন ও আদালতের অবস্থান
গত বছরের তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আইইইপিএ আইনের আশ্রয় নেয়। এই আইন জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে বিদেশি লেনদেন “নিয়ন্ত্রণ” করার ক্ষমতা নির্বাহী শাখাকে দেয়।
কিন্তু ৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায়, আইইইপিএ প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস আদালতের পক্ষে লিখেছেন, সংবিধান প্রণেতারা কর আরোপের ক্ষমতা নির্বাহী শাখার হাতে দেননি। আদালত আরও উল্লেখ করে, কংগ্রেস যখন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তখন তা স্পষ্ট ভাষায় এবং কঠোর সীমার মধ্যে করেছে।

এই রায় শুধু বর্তমান বাণিজ্য নীতির জন্য নয়, সাংবিধানিক ভারসাম্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আদালত ট্রাম্পের পদক্ষেপ সীমিত না করত, তবে আমদানি শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কার্যত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। সেটি হতো সংবিধানের এক বড় রূপান্তর।
লিবারেশন ডে শুল্কের অবসান, কিন্তু নতুন পথের সন্ধান
রায়ের ফলে ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক কার্যত ইতিহাস হয়ে গেছে, যদিও আদায় করা রাজস্ব ফেরত দেওয়ার জটিল প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তবে স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ট্রাম্প দ্রুতই নতুন করে শুল্ক বাড়ান।
আইইইপিএর অধীনে দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হারের পরিবর্তে তিনি ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারা ব্যবহার করে সব আমদানির ওপর সমান ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, যা শিগগিরই ১৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এই ধারা অনুযায়ী বড় ও গুরুতর পেমেন্ট ঘাটতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করা যায়। এরপর তা বহাল রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
নির্বাচনী বছরে কংগ্রেসকে বেশি শুল্কে ভোট দিতে বাধ্য করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুল্ক সাধারণভাবে অজনপ্রিয়, আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাছাড়া দলটির ভেতরেই এ নিয়ে মতভেদ আছে।
আইনি চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক বিতর্ক

নতুন শুল্কও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সত্যিই কি যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের পেমেন্ট ঘাটতিতে ভুগছে? বহু অর্থনীতিবিদের মতে, এই ভাষা ব্রেটন উডস যুগের স্থির বিনিময় হার ব্যবস্থার পুরোনো ধারণা, যা ১৯৭০-এর দশকে শেষ হয়েছে।
এছাড়া ১২২ ধারায় বলা হয়েছে, শুল্কের প্রয়োগ হতে হবে পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও অভিন্ন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে কফি থেকে স্মার্টফোন পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যে ছাড় দিয়েছে। এতে আইনের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে। আইইইপিএর বিস্তৃত স্বাধীনতা আর নেই, আর ১২২ ধারা দেশভেদে ভিন্ন আচরণের সুযোগও কমিয়ে দেয়। অথচ দেশভেদে চাপ প্রয়োগ করা ট্রাম্পের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
অন্য আইনি অস্ত্র: ৩০১ ও ২৩২ ধারা
তবে প্রেসিডেন্টের হাতে অন্য আইনি পথ এখনো খোলা। ৩০১ ধারা ব্যবহার করে প্রথম মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। অন্য দেশকে ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’কারী ঘোষণা করে একই পথ আবারও নেওয়া সম্ভব।
এছাড়া ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টের ২৩২ ধারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি সীমিত করার সুযোগ দেয়। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে এটি ইতিমধ্যেই প্রয়োগ হয়েছে, এবং প্রশাসন আরও ক্ষেত্রে তা ব্যবহারের কথা ভাবছে।

তবে এসব ধারা প্রয়োগে মামলা দায়ের, তদন্ত, প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মতো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এতে শুল্ক আরোপের গতি ধীর হতে পারে, কিন্তু হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
আইইইপিএ শুল্কের ফলে যেসব দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। অনেক দেশ সরাসরি চুক্তি বাতিল করতে চাইবে না, কারণ এতে প্রেসিডেন্টকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির সাম্প্রতিক ওঠানামা ব্যবসা ও বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আদালতের রায়ের পরও অনেকে আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধোত্তর আমেরিকান বাণিজ্য আইনে কংগ্রেসের অতিরিক্ত নমনীয়তার একটি অপ্রত্যাশিত ফাঁক রয়ে গেছে।

কংগ্রেসের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস এই ধারণায় প্রেসিডেন্টকে বাণিজ্য ক্ষমতা অর্পণ করেছে যে, তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং কংগ্রেসের ভেতরের স্থানীয় স্বার্থের চাপকে ভারসাম্য করবেন। ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় থাকা দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি ভোক্তা ও রপ্তানিকারকদের স্বার্থও বিবেচনায় নেবেন।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি শান্ত হলে কংগ্রেস হয়তো প্রেসিডেন্টের স্বেচ্ছাচারী শুল্ক আরোপের ক্ষমতায় সময়সীমা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা ভাবতে পারে। তবে এমন আইন কার্যকর করতে হলে তা বড় কোনো আইন প্যাকেজের অংশ হিসেবে পাস করাতে হবে, কারণ প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার আলাদা বিল ভেটোর মুখে পড়তে পারে।
এ মুহূর্তে বিশ্বকে ট্রাম্পের শুল্ক প্রাচীর পুনর্গঠনের অঙ্গীকারকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। বিভিন্ন আইনের অধীনে তার হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে, যদিও তা আগের চেয়ে বেশি সীমাবদ্ধ ও জটিল। সুপ্রিম কোর্ট হয়তো এক ব্যক্তির শুল্ক আসক্তির ইতি টানবে—এমন আশা আপাতত বাস্তবসম্মত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















