২০২১ সালে তালেবানের দ্রুত সামরিক অভিযানে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের পতনের পর ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। সে সময় পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান কাবুলে গিয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পাঁচ বছর পর সেই আশ্বাস ভেঙে গিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে পাকিস্তান ও আফগান তালেবানের মধ্যে চলমান সংঘাতকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ‘খোলা যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক অস্থিরতার সূচনা করতে পারে।
সংঘাতের মূল কারণ
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। এসব গোষ্ঠী পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক হামলা চালিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে।

অন্যদিকে আফগান তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সমস্যা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। দুই পক্ষের এই অবস্থানগত পার্থক্যই বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান দীর্ঘদিনের সমর্থনের বিনিময়ে তালেবানের কাছ থেকে আনুগত্য আশা করেছিল। কিন্তু তালেবান নিজেদের স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখেছে এবং ইসলামাবাদের প্রতি বাধ্যবাধকতা অনুভব করেনি। এই কাঠামোগত ভুল বোঝাবুঝিই আজকের সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করেছে।
সীমান্ত উত্তেজনা থেকে সরাসরি হামলা
দুই দেশের প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম সীমান্তে গত কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা বাড়ছিল। গত অক্টোবরে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। তবে সাম্প্রতিক লড়াই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পাকিস্তান এবার যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে সরাসরি তালেবানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্রের মতে, কাবুল ও কান্দাহারসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। কান্দাহার তালেবান প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা নতুন ও অজানা পরিস্থিতির সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এভাবে সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতা ডেকে আনতে পারে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি
দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল এখন অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল।
বিশেষ করে গত মে মাসে চার দিনের লড়াইয়ের পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কও তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আফগান সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পাকিস্তানের জন্য ‘দ্বিমুখী সংকট’ তৈরি করতে পারে।
সামরিক সক্ষমতার পার্থক্য
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার। তাদের কাছে শত শত যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান ও ভারী আর্টিলারি রয়েছে।

অন্যদিকে আফগান তালেবানের সক্রিয় সদস্য প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার। তাদের সীমিত সাঁজোয়া যান থাকলেও কার্যকর কোনো বিমানবাহিনী নেই।
তবে তালেবান দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ২০০১ সালে পশ্চিমা সামরিক জোটের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা টিকে ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, তালেবান চাইলে সীমান্ত সংঘাতের পাশাপাশি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ও বালুচ লিবারেশন আর্মির মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বাড়াতে পারে, যা পাকিস্তানের ভেতরে অস্থিরতা বাড়াবে।
দ্বিমুখী হুমকির আশঙ্কা
বালুচিস্তান প্রদেশ, যা ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তঘেঁষা, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহের কেন্দ্র। বালুচ লিবারেশন আর্মি সেখানে বড় আকারের সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান বহুবার ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থনের অভিযোগ তুললেও নয়াদিল্লি তা অস্বীকার করেছে।

কূটনৈতিক মহলের মতে, আফগান সীমান্তে দীর্ঘ সংঘাত এবং পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা—এই দুই চাপ একসঙ্গে সামলানো পাকিস্তানের জন্য দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
মধ্যস্থতার চ্যালেঞ্জ
চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারসহ একাধিক দেশ মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের প্রত্যাশার ব্যবধান অত্যন্ত বড়। এই ব্যবধান কমিয়ে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কের এই অবনতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে সহিংসতা ও অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















