ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত সেই পথেই হাঁটলেন, যে পথ থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকার তিনি বহুবার করেছিলেন। নিজেই একে “বড় এবং চলমান” অভিযান হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন, এতে মার্কিন প্রাণহানিও হতে পারে। আর এখানেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক—এ কি শুধু সামরিক হামলা, নাকি সরাসরি শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টা?
যুদ্ধ নাকি শাসন পরিবর্তন?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি ইরানের জনগণের স্বাধীনতা চান। তবে তাঁর বক্তব্যের ভেতরেই উঠে এসেছে বড় লক্ষ্য—বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান। এর আগে জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন জানিয়েছিল, সেটি শাসন পরিবর্তনের জন্য নয়। কিন্তু এবার ভাষা ও অবস্থান দুইই ভিন্ন।
এই অভিযানকে তিনি যুদ্ধ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। এমনকি আগাম জানিয়েছেন, এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি সীমিত প্রতিরোধমূলক হামলা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সূচনা?

অতীতের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ
২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে শাসন পরিবর্তনের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ইরাক, লিবিয়া, মিসর ও সিরিয়ায় আগের প্রশাসনের পদক্ষেপকে তিনি ব্যর্থ বলে আখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরিকল্পনাহীনভাবে সরকার পতন ঘটালে সন্ত্রাসবাদ শক্তিশালী হয় এবং ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়।
২০১৯ সালেও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাজ বিশ্বে পুলিশিং করা নয়। বরং দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করাই সামরিক বাহিনীর মূল দায়িত্ব। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এবার তিনি সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসন কাঠামো বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বনাম বর্তমান বাস্তবতা
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজেকে শান্তির প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রচারণা দল বলেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেই এমন এক অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
তিনি বলেছেন, এই মিশন ভবিষ্যতের জন্য। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। তবে সমালোচকদের মতে, সুস্পষ্ট কৌশল বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ওবামা নিয়ে পুরোনো মন্তব্য, আজকের বাস্তবতা
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ট্রাম্প একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, জনপ্রিয়তা কমে গেলে ওবামা ইরানে হামলা চালাতে পারেন। তিনি দাবি করেছিলেন, আলোচনা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ওবামা যুদ্ধের পথে যেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে ওবামা ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন এবং সরাসরি হামলা চালাননি।
এবার ট্রাম্প নিজেই ইরানে একাধিকবার হামলা চালিয়েছেন। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। ফলে অতীতের বক্তব্য এখন তাঁর বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সামনে কী?
মার্কিন প্রশাসন এখনও পূর্ণাঙ্গ কৌশল প্রকাশ করেনি। ইরানে শাসন পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা লাগতে পারে। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়বে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে। আর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া তীব্র হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















