ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির মৃত্যুর দাবি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। স্যাটেলাইট ছবিতে রাজধানীতে তাঁর বাসভবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ্যে আসার পর জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।

তিন দশকের বেশি সময়ের কঠোর শাসন
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের নেতৃত্বে থাকা খামেনি পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে ওঠে, সেটিকে আরও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। নির্বাচিত সরকার থাকলেও বড় কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত তাঁর অনুমোদন ছাড়া কার্যকর হতো না।
দেশের ভেতরে বিরোধিতা দমনেও তিনি ছিলেন অনড়। মূল্যবৃদ্ধি ও সামাজিক ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’ স্লোগানে রাস্তায় নামা বহু মানুষ গ্রেপ্তার, কারাবন্দি কিংবা প্রাণ হারান।
আঞ্চলিক জোট আর প্রক্সি কৌশল
খামেনির নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক জটিল মিত্রজাল গড়ে তোলে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনে হামাসসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কৌশল নেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রভাব কমতে শুরু করে। সিরিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন, লেবাননে চাপ এবং গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগের দাবি জানালে খামেনি তা সরাসরি নাকচ করেন। তাঁর মতে, ক্ষেপণাস্ত্রই ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের প্রধান প্রতিরোধশক্তি। এই অনমনীয় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতের পথ প্রশস্ত করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ক্ষমতার ভিত: বিপ্লবী গার্ড ও অর্থনৈতিক প্রভাব
খামেনির ক্ষমতার মূল স্তম্ভ ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ। বড় বড় বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনীই সামনে থেকেছে। ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিতর্ক, ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এছাড়া তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের ভেতরে প্রভাব বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
দুর্বল সূচনা থেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা
শুরুতে অনেকেই তাঁকে তুলনামূলক দুর্বল নেতা হিসেবে দেখতেন। ধর্মীয় মর্যাদার দিক থেকেও তিনি পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সমতুল্য ছিলেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে নিরাপত্তা কাঠামো নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান তৈরি করেন।
একসময় বোমা হামলায় আহত হয়ে তাঁর ডান হাত পঙ্গু হয়ে যায়। শাহ শাসনের সময় একাধিকবার কারাবরণও করেন। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই তাঁর নেতৃত্বকে কঠোর ও সন্দেহপ্রবণ করে তোলে বলে গবেষকদের ধারণা।
সামনে কী?
যদি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়, তবে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি হবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। নেতৃত্বের উত্তরাধিকার, আঞ্চলিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন—সবকিছুই নতুন অনিশ্চয়তায় পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















