দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানে ইরানে একযোগে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। শনিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া বিস্ফোরণের পর রোববার ভোরে তেহরান থেকে খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা আসে। এর পরই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

টানা নজরদারির পর চূড়ান্ত আঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, খামেনির অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল। তার ভাষায়, ইরানের নেতৃত্বকে টার্গেট করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, খামেনির কমপাউন্ড সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুইশ যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এই অভিযানে। ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় পাঁচশর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ, বিপ্লবী গার্ডসের শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলী শামখানিও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তেহরানে আতঙ্ক, কোথাও আবার উল্লাস
তেহরান, কারাজ ও ইসফাহানে খামেনির মৃত্যুর খবরে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উল্লাস করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে বিস্ফোরণের শব্দে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। তাবরিজের এক বাসিন্দা ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার শিশুরা ভয়ে কাঁপছে, কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি উঠেছে। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরানের পাল্টা হামলা ও উপসাগরে সংকট
হামলার জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে দেয় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের দিকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তেল আবিবে একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় অন্তত বিশজন আহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই, কাতারের দোহা এবং কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেও হামলার খবর মিলেছে।
ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থা
সপ্তাহজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চললেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে রাজি হয়নি তেহরান। ইরান বলছে, তাদের কর্মসূচি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, কিন্তু ওয়াশিংটনের আশঙ্কা তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রাশিয়া ও চীন এই হামলার সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, আলোচনা চলাকালেই সামরিক আঘাত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের ধারাবাহিক অভিযানে ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়েছে। সর্বশেষ এই হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। এখন সবার নজর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















