মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অঞ্চল ও বিশ্বরাজনীতিকে নতুন এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
এই হামলাকে ইসরায়েল “আগাম আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ” বলে ব্যাখ্যা করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এটি তাৎক্ষণিক কোনো আক্রমণ ঠেকানোর প্রতিক্রিয়া নয়, বরং পরিকল্পিত এক রাজনৈতিক যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল সুযোগ দেখেই নেওয়া এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
কেন এখন এই হামলা
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব ছিল, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখন দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট, বছরের শুরুতে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান এবং গত গ্রীষ্মের যুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয়—সব মিলিয়ে তেহরানকে নাজুক মনে হয়েছে তাদের কাছে। এই পরিস্থিতিকে তারা হাতছাড়া করতে চায়নি।
তবে এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরা হলেও সামরিক শক্তির ভারসাম্য বিবেচনায় তা কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের লক্ষ্য
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখছেন। তাঁর কাছে এই হামলা তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার বড় সুযোগ। একই সঙ্গে সামনে থাকা নির্বাচনের আগে যুদ্ধ পরিস্থিতি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে মজবুত করতে পারে—এমন ধারণাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান সময়ের সঙ্গে বদলেছে। একদিকে তিনি ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বড় হুমকি বলেছেন, অন্যদিকে আগের সংঘাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে বলেও দাবি করেছিলেন। এখন তিনি ইরানি জনগণের উদ্দেশে “স্বাধীনতার সময় এসেছে” বার্তা দিয়েছেন।

পারমাণবিক ইস্যু কতটা বাস্তব
ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে তারা যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে যে, অন্তত অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা ছিল তাদের। তবু এই হামলার আগে তাৎক্ষণিক অস্ত্র তৈরির প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
শাসন পরিবর্তন কি সম্ভব
শুধু আকাশপথের হামলায় কোনো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নজির খুবই কম। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতন হয়েছিল স্থল অভিযান ও দখলের মাধ্যমে। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনও হয়েছিল বিদ্রোহী শক্তির সঙ্গে বহিরাগত সামরিক সহায়তায়। দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
ইরানেও যদি শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়, তার জায়গায় মানবাধিকারভিত্তিক উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশে বিকল্প কোনো গ্রহণযোগ্য সরকার অপেক্ষায় আছে, এমন বাস্তবতাও নেই। প্রায় অর্ধশতকে ইরানের শাসকগোষ্ঠী একটি জটিল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে মতাদর্শ, প্রভাব ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মিলেমিশে রয়েছে।

খামেনি নিহত হলেও কী বদলাবে
ইসরায়েল অতীতে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে ইরান কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, এটি একটি রাষ্ট্র। সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই ধারণা।
ট্রাম্প আত্মসমর্পণ করলে দায়মুক্তির প্রস্তাব দিলেও ইরানের সামরিক নেতৃত্ব তা গ্রহণ করবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ তাদের রাজনৈতিক দর্শনে আত্মত্যাগ একটি শক্তিশালী ধারণা।

আলোচনার পথ কেন ভেঙে গেল
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, যা পরে ট্রাম্প প্রত্যাহার করেন। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন ত্যাগের দাবি ইরানের কাছে আত্মসমর্পণের সমান মনে হয়েছে। ফলে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
এখন ইরানের বাকি নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে এই যুদ্ধ টিকে থাকা যাবে এবং এর রাজনৈতিক পরিণতি সামলানো হবে। প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, নতুন করে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
মধ্যপ্রাচ্য বহুবার বৈশ্বিক অস্থিরতার উৎস হয়েছে। নতুন এই যুদ্ধ সেই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















