আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত তৃতীয় দিনে গড়াতেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি, আকাশ হামলা এবং পাল্টা অভিযানের মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবিলম্বে উত্তেজনা কমানো ও সব ধরনের শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

উত্তেজনা কমাতে তৎপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস এক বিবৃতিতে বলেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সহিংসতা, সীমান্তপারের হামলা এবং গত ২৪ ঘণ্টায় চালানো আঘাত পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সব পক্ষকে অবিলম্বে সংঘাত থামাতে হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, আফগান ভূখণ্ড কোনোভাবেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলা বা হুমকির ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। আফগানিস্তানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে দেশের ভেতরে সক্রিয় সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয় দিনে প্রবেশ যুদ্ধ, সীমান্তে গোলাগুলি অব্যাহত
পাকিস্তান ও আফগান তালেবান বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ টানা তৃতীয় দিনে পৌঁছেছে। রাতভর সীমান্তে গুলিবিনিময় হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত সংলাপের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি এখনো অস্থির।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শুক্রবার চালানো বিমান হামলায় কাবুল ও কান্দাহারসহ বিভিন্ন এলাকায় তালেবান সামরিক স্থাপনা ও চৌকিতে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি প্রতিবেশী দেশে পাকিস্তানের অন্যতম গভীর সামরিক অভিযান বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পারস্পরিক অভিযোগে উত্তপ্ত দুই দেশ
ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, আফগানিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান নামের গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানের ভেতরে বিদ্রোহী তৎপরতা চালাচ্ছে। তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পাকিস্তান বলছে, সীমান্তপারের হামলার জবাব হিসেবেই তাদের পদক্ষেপ। অন্যদিকে কাবুল একে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, সংলাপের পথ খোলা থাকলেও সংঘাত বিস্তৃত হলে তার পরিণতি হবে গুরুতর।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা
সংঘাত ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সৌদি আরবের যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

রাশিয়া দুই পক্ষকে সংঘর্ষ বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তার প্রস্তুতির কথা বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তালেবানের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার পাকিস্তানের রয়েছে। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেছে, পরিস্থিতি যেন আর বিস্তৃত না হয়।
অভিযান, হতাহতের দাবি ও বাস্তবতা
পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ‘গাজাব লিল হক’ নামে একটি সামরিক অভিযান চলছে এবং একাধিক তালেবান ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের দাবি একেবারেই ভিন্ন।
পাকিস্তানের দাবি, তাদের ১২ সেনা নিহত এবং ২৭৪ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তালেবানের দাবি, তাদের ১৩ যোদ্ধা ও ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশে ১৯ বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছে বলে তালেবান জানিয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

‘খোলা যুদ্ধ’ সতর্কবার্তা
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘খোলা যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে আরও হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তালেবান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি খোস্তে এক ভাষণে বলেন, এই সংঘাত খুব ব্যয়বহুল হবে। তিনি দাবি করেন, প্রযুক্তির জোরে নয়, বরং ঐক্য ও ধৈর্যের শক্তিতে তারা অতীতে টিকে থেকেছে।

সামরিক শক্তির পার্থক্য
পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আধুনিক বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। বিপরীতে তালেবানদের কোনো প্রচলিত বিমানবাহিনী নেই, তারা মূলত হালকা অস্ত্র ও স্থলবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল।
তবে দুই দশকের দীর্ঘ বিদ্রোহী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে অভ্যস্ত ও সংগঠিত করেছে। ফলে সীমান্তজুড়ে ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















