০৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

ইরান ব্লাফ করেনি

ফেব্রুয়ারির শুরুতে পারমাণবিক আলোচনার প্রথম দফার আগে ইরানি সাংবাদিকরা যখন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন, সবার মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—আলোচনার মাঝপথে আবারও কি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

কূটনীতিকদের সতর্ক বার্তা
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় কূটনীতিকরা খোলামেলা ছিলেন। তাদের ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসন সত্যিই কোনো চুক্তি চায় কি না, তার নিশ্চয়তা ছিল না। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আলোচনার টেবিলে আবার বোমা পড়লে তার ফল ভয়াবহ হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মার্কিন পক্ষকে বার্তা দিয়েছিলেন—ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরোপিত আগের সংঘাতের চেয়েও বড় আকার ধারণ করবে।

আলোচনা শুরুর কয়েক দিন আগে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি ঘোষণা করেন, পরবর্তী যুদ্ধ হবে আঞ্চলিক যুদ্ধ।

ট্রাম্পের আগের যুদ্ধ ও ব্যর্থতা
গত বছরের সংঘাতে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। একইভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের দীর্ঘদিনের মার্কিন স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়নি।

যুদ্ধের দায় স্বীকারে ট্রাম্প সময় নেন। শুরুতে তার প্রশাসন দাবি করেছিল, ইসরায়েল একাই ইরানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে। সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তবে কয়েক মাস পর সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প স্বীকার করেন, ১২ দিনের সেই যুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি দায়িত্বে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য হতাহতের দায় এড়াতেই প্রশাসন শুরুতে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল।

এইবার ভিন্ন চিত্র
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্নভাবে মোড় নেয়। শনিবার সকালে তেহরানসহ বিভিন্ন ইরানি শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার পর দুই দেশই যৌথভাবে দায় স্বীকার করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, মাসের পর মাস ঘনিষ্ঠ ও যৌথ পরিকল্পনার ফল এই হামলা। ট্রাম্পও বিবৃতি দিয়ে গর্বের সঙ্গে বলেন, আট মাসের মধ্যে দুইবার—তাও পারমাণবিক আলোচনার সময়—ইরানে হামলা চালানো একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট তিনি।

প্রশ্ন উঠছে, আগেরবার যেখানে জড়িত থাকার বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল, এবার কেন ট্রাম্প তা প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন?

ভুল হিসাবের অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো মনে করেছিলেন ইরানের আঞ্চলিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি কেবল কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করার জন্য দেওয়া। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেছিলেন, আগের মতো হামলা চালিয়ে অস্থিরতা উসকে দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করা সম্ভব হবে, ইরান তার সতর্কবার্তা বাস্তবায়ন করার আগেই।

কিন্তু ইরানকে জুয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ইতিহাসে ইরানিরা দাবার চালের মতো হিসাব করে পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রকাশ্যে অবস্থান জানায় এবং পরে তা বাস্তবায়ন করে। বিদেশি আগ্রাসনের পক্ষে ইরানি জনগণ দাঁড়াবে না—এমন ধারণাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রস্তুতিও ছিল দ্রুতগতিতে।

সম্ভাব্য পরবর্তী পরিস্থিতি
আসন্ন দিনগুলোতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে, ইসরায়েলের শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং পূর্বে অপ্রকাশিত মার্কিন স্থাপনাতেও আঘাত হানতে পারে—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারাই এই সংঘাতের পূর্ণ দায় বহন করবেন। তেহরান থেকে আসা স্পষ্ট সতর্কবার্তাকে অবমূল্যায়ন করার ফল এখন তাদেরই মোকাবিলা করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান ব্লাফ করেনি

০৪:৫৪:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

ফেব্রুয়ারির শুরুতে পারমাণবিক আলোচনার প্রথম দফার আগে ইরানি সাংবাদিকরা যখন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন, সবার মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—আলোচনার মাঝপথে আবারও কি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

কূটনীতিকদের সতর্ক বার্তা
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় কূটনীতিকরা খোলামেলা ছিলেন। তাদের ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসন সত্যিই কোনো চুক্তি চায় কি না, তার নিশ্চয়তা ছিল না। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আলোচনার টেবিলে আবার বোমা পড়লে তার ফল ভয়াবহ হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মার্কিন পক্ষকে বার্তা দিয়েছিলেন—ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরোপিত আগের সংঘাতের চেয়েও বড় আকার ধারণ করবে।

আলোচনা শুরুর কয়েক দিন আগে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি ঘোষণা করেন, পরবর্তী যুদ্ধ হবে আঞ্চলিক যুদ্ধ।

ট্রাম্পের আগের যুদ্ধ ও ব্যর্থতা
গত বছরের সংঘাতে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। একইভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের দীর্ঘদিনের মার্কিন স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়নি।

যুদ্ধের দায় স্বীকারে ট্রাম্প সময় নেন। শুরুতে তার প্রশাসন দাবি করেছিল, ইসরায়েল একাই ইরানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে। সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তবে কয়েক মাস পর সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প স্বীকার করেন, ১২ দিনের সেই যুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি দায়িত্বে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য হতাহতের দায় এড়াতেই প্রশাসন শুরুতে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল।

এইবার ভিন্ন চিত্র
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্নভাবে মোড় নেয়। শনিবার সকালে তেহরানসহ বিভিন্ন ইরানি শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার পর দুই দেশই যৌথভাবে দায় স্বীকার করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, মাসের পর মাস ঘনিষ্ঠ ও যৌথ পরিকল্পনার ফল এই হামলা। ট্রাম্পও বিবৃতি দিয়ে গর্বের সঙ্গে বলেন, আট মাসের মধ্যে দুইবার—তাও পারমাণবিক আলোচনার সময়—ইরানে হামলা চালানো একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট তিনি।

প্রশ্ন উঠছে, আগেরবার যেখানে জড়িত থাকার বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল, এবার কেন ট্রাম্প তা প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন?

ভুল হিসাবের অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো মনে করেছিলেন ইরানের আঞ্চলিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি কেবল কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করার জন্য দেওয়া। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেছিলেন, আগের মতো হামলা চালিয়ে অস্থিরতা উসকে দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করা সম্ভব হবে, ইরান তার সতর্কবার্তা বাস্তবায়ন করার আগেই।

কিন্তু ইরানকে জুয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ইতিহাসে ইরানিরা দাবার চালের মতো হিসাব করে পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রকাশ্যে অবস্থান জানায় এবং পরে তা বাস্তবায়ন করে। বিদেশি আগ্রাসনের পক্ষে ইরানি জনগণ দাঁড়াবে না—এমন ধারণাই দেশটির নীতিনির্ধারকদের। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রস্তুতিও ছিল দ্রুতগতিতে।

সম্ভাব্য পরবর্তী পরিস্থিতি
আসন্ন দিনগুলোতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে, ইসরায়েলের শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং পূর্বে অপ্রকাশিত মার্কিন স্থাপনাতেও আঘাত হানতে পারে—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারাই এই সংঘাতের পূর্ণ দায় বহন করবেন। তেহরান থেকে আসা স্পষ্ট সতর্কবার্তাকে অবমূল্যায়ন করার ফল এখন তাদেরই মোকাবিলা করতে হবে।