ইরানে নজিরবিহীন যৌথ হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার নিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই হামলা? হঠাৎ এমন কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব কী?
ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক জুয়া
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে শান্তির বার্তাবাহক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিলেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ ও ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এই অভিযান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতির ঝুঁকি।
পারমাণবিক কর্মসূচি থামানোই প্রধান লক্ষ্য
ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেওয়া হবে না। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, গত বছর হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হলেও তেহরান আবার তা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বক্তব্য, ইরান বিপজ্জনক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছিল, যা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত।
অন্যদিকে তেহরান বরাবরই বলে এসেছে, তাদের কর্মসূচি বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো মনে করে, এত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণের পেছনে গ্রহণযোগ্য বেসামরিক কারণ নেই।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন প্রশাসনের আরেকটি বড় অভিযোগ, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা ইউরোপে অবস্থানরত মিত্র দেশ ও বিদেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ট্রাম্প দাবি করেন, এসব ক্ষেপণাস্ত্র একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে। যদিও এই দাবির পক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, ইরানি গণমাধ্যমে দূরপাল্লার নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন ও মিত্রদের নিরাপত্তা যুক্তি
ট্রাম্প বলেন, ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করতেই এই হামলা। তিনি ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল, বৈরুতে মার্কিন সেনা ব্যারাকে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক আক্রমণের কথা উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, ইরান বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে।
বিক্ষোভ দমন ইস্যু
ট্রাম্প ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর অভিযোগও তোলেন। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। তেহরান দাবি করেছে, সরকারিভাবে যাচাই করা সংখ্যা অনেক কম। এই মানবাধিকার ইস্যুকেও হামলার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন।
শাসন পরিবর্তনের আহ্বান
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে শাসন পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্বাধীনতার মুহূর্ত উপস্থিত। একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য, তেলবাজার, বৈশ্বিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বিশ্বকে আরেক দফা বড় সংঘাতের মুখে ঠেলে দেবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে স্পষ্ট, ইরান হামলার পেছনে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য একসঙ্গে কাজ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















