আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই, যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করেছেন, ৮৬ বছর বয়সে নিহত হয়েছেন।
রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরান ও এর আশপাশের স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর তার মৃত্যু ঘটে। আধা-সরকারি ফার্স বার্তা সংস্থা অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানায়, ওই হামলায় খামেনেইর মেয়ে, জামাতা, এক নাতি ও পুত্রবধূও নিহত হন। ইরানি কর্তৃপক্ষ ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং সাত দিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে।
খামেনেইর মৃত্যু সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি, যা তিনি ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন এবং পরে শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ডের ভিত্তিতে একটি কঠোর ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ দেন। তার শাসনকাল জুড়ে ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, বারবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ, আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তির উত্থান-পতন এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘ পারমাণবিক অচলাবস্থা।
বিপ্লব থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে
১৯৭৯ সালের আগে তিনি ছিলেন ধর্মীয় ছাত্র ও শাহবিরোধী কর্মী।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে সক্রিয় সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে রাষ্ট্রের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দমননীতি ও আঞ্চলিক কৌশল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখেন।
![]()
শৈশব ও বিপ্লবী শিকড়
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেনেই। তার বাবা ছিলেন একজন ধর্মীয় আলেম, ফলে অল্প বয়সেই তিনি ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন।
শৈশব থেকেই ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে পরে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র কুমে যান। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ সহচর ও ছাত্রে পরিণত হন, যিনি শাহবিরোধী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তিনি শাহবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। শাহের গোপন পুলিশ সাভাকের হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং কারাবরণ ও নির্বাসনের মুখোমুখি হন। এ সময়কার সক্রিয়তা তাকে বিপ্লবী নেতৃত্বের সারিতে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ভূমিকা
শাহ সরকারের পতনের সময় খামেনেই বিক্ষোভ সংগঠনে এবং খোমেনির আদর্শ প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিপ্লব সফল হওয়ার পর গঠিত বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হন।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তিনি দ্রুত প্রভাবশালী পদে অধিষ্ঠিত হন। উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক দৃশ্যমানতাকে একত্রিত করেছিল।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে উত্থান
১৯৮১ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি বিধ্বংসী যুদ্ধের মধ্যে সরকারের কার্যক্রম তদারক করেন এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। পরবর্তীতে এই বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নীতিতে কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রপতি থাকাকালে এক বোমা হামলায় তিনি আহত হন, যার ফলে তার ডান হাত স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়া
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খামেনেইকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। সংবিধানে সামান্য সংশোধন এনে ধর্মীয় যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়, যাতে তিনি এই পদ গ্রহণ করতে পারেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি সামরিক বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। বিচার বিভাগের প্রধান, নিরাপত্তা কমান্ডার ও বিভিন্ন ধর্মীয় পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগেও তার সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত।
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি
খামেনেইর শাসনামলে ১৯৯৯ সালের ছাত্র বিক্ষোভ, ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন এবং ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়। ক্ষমতা ক্রমশ রক্ষণশীল ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাড়তে থাকে। নির্বাচন, গণমাধ্যম ও জনপরিসরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সংস্কারপন্থী শক্তিকে সীমিত রাখা হয়।

বৈদেশিক নীতিতে তার নেতৃত্বে ইরান ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে মিত্র মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করে, যা প্রায়ই প্রতিরোধ অক্ষ নামে পরিচিত। একই সঙ্গে তিনি বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নেন, যদিও পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ফরমান জারি করেছিলেন।
উত্তরাধিকার ও শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ সময় ধরে খামেনেই বিপ্লব রক্ষার নামে কঠোর কর্তৃত্ববাদী শাসন বজায় রাখেন। সমর্থকদের কাছে তিনি সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে প্রশংসিত হলেও সমালোচকদের চোখে তার শাসন ছিল দমন-পীড়ন ও স্থবিরতার প্রতীক।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। এর মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ছত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ের অধ্যায়ের নাটকীয় সমাপ্তি ঘটে।
স্টিফেন এন 

















