১৯৮৯ সালে জ্যেষ্ঠ আলেমরা যখন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনোনীত করেন, তখন তিনি নিজেকে অযোগ্য বলে দাবি করেছিলেন।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়া ৮৬ বছর বয়সী খামেনি বিশেষজ্ঞ পরিষদের আলেমদের বলেছিলেন, তাকে বিবেচনা করা হলে ইসলামী সমাজের জন্য তা “অশ্রু বিসর্জনের বিষয়” হবে।
তবে পরবর্তী সময়ে খামেনি ইরানের আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম শাসকদের একজন হয়ে ওঠেন। প্রাথমিক নম্রতার জায়গা দখল করে নেয় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা এবং তা ধরে রাখতে কট্টরপন্থীদের ওপর নির্ভরতা।
তার ৩৭ বছরের শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি বৈরিতাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি। এক সংস্কারপন্থী রাজনীতিক একে শাসনব্যবস্থার “মূল পরিচয়” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
“শত্রু” সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন পশ্চিমা দেশ ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনপুষ্ট ইরাকের বিরুদ্ধে তিনি সামরিক পোশাকে ফ্রন্টলাইনে উপস্থিত থাকতেন। তেহরানে ক্ষমতায় এসে তিনি আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী গড়ে তোলেন, সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করেন, আঞ্চলিক সংঘাতকে কাজে লাগান এবং ইরানের বিরুদ্ধে বিদেশি আগ্রাসন ঠেকাতে অঞ্চলকে অস্থির রাখার কৌশল নেন। লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আর্থিক ও সামরিক সহায়তার কথা তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করতেন।
তার কঠোর নীতির কারণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আশঙ্কা তৈরি হয়, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করতে পারে। ২০১৫ সালে প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হয়ে খামেনি নিজের ভাষায় “বীরোচিত নমনীয়তা” প্রদর্শন করেন। তথাকথিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রায় সম্পূর্ণ স্থগিতের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে যায়।
কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান চুক্তি মেনে চলা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন এবং তেহরানের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসে অর্থায়ন” এর অভিযোগ তোলেন। এতে খামেনির দীর্ঘদিনের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং তারা ইরানের ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করতে চায়।
পরবর্তী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে। তেল আয়ের প্রবাহ কমে যায়, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত হয়।
খামেনি প্রায়ই চার বছর অন্তর নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের ওপর অর্থনৈতিক ব্যর্থতার দায় চাপাতেন এবং আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর কথা বলতেন, যদিও প্রধান নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতেই ছিল। এক আত্মীয়ের ভাষায়, বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কায় তিনি দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহের বিরোধিতা করতেন।
আরেক আত্মীয় জানান, খামেনি বলেছিলেন, তিনি চান না ইরান আরেকটি মালয়েশিয়া হোক; তিনি এমন একটি মডেল চান, যেখানে কোনো ইরানি ক্ষুধার্ত থাকবে না।
কিন্তু নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক দমন-পীড়ন ভিন্নমতকে উসকে দেয় এবং বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। তার মৃত্যুকালে সরকারি স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ দারিদ্র্যে বসবাস করছিল।
তার শাসনামলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে গভীর ব্যবধান তৈরি হয়। ক্রমে তিনি এক বয়স্ক ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন, যাকে অনেকেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, অনমনীয় এবং অর্থবহ পরিবর্তনে অনিচ্ছুক বলে মনে করতেন। ফলে প্রতিবাদ আরও ঘনঘন ও সহিংস হয়ে ওঠে, এবং খামেনি নিজেই হয়ে ওঠেন মূল লক্ষ্য।

২০০৯, ২০১৭, ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৬ সালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো প্রাণহানি ঘটে। “খামেনির মৃত্যু চাই” স্লোগানে মুখর আন্দোলন তার শাসনের বৈধতাকে আরও ক্ষয় করে।
২০২৬ সালের শুরুতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজারো বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনার সাফাই দিতে গিয়ে তিনি বলেন, শাসন টিকিয়ে রাখতে অতীতে লক্ষাধিক “মহান মানুষ” প্রাণ দিয়েছেন।
তবে ২০২০-এর দশকের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপরিচয় ধারণ করা ইরান ধীরে ধীরে আঞ্চলিক প্রভাব হারাতে থাকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হয়। ইসরায়েল গাজা ছাড়াও ইরান ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ খামেনির ঘনিষ্ঠদের হত্যা করা হয়, যাকে তিনি পুত্রসম মনে করতেন।
তবু তিনি পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের প্রতি বৈরিতার নীতি বদলাননি। ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের বিরুদ্ধে লড়তে অন্যদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র চাইতে হওয়া দেশটি তার শাসনে নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে ইরান পাল্টা ইসরায়েলে আঘাত হানে। তার মৃত্যুর পরও ইসরায়েল ও অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হয়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা ছিল তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পূর্বসূরির থেকে ভিন্নভাবে তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এর ফলে আলেম সমাজ ও বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী শ্রেণির মতো ঐতিহ্যগত শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, যারা ১৯৭৯ সালে শাহের বিরুদ্ধে বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মৃত্যুর সময় তার প্রধান অনুগত শক্তি ছিল বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, আর শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরও অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত।
এক পশ্চিমা কূটনীতিক মন্তব্য করেন, তার শাসন ছিল বিনিয়োগের চেয়ে লেনদেনকেন্দ্রিক। তার ভাষায়, দেশের সম্পদ লেনদেনেই শেষ হয়েছে।
১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে খামেনির জন্ম।
সম্মানিত কিন্তু দরিদ্র আলেম পরিবারে বেড়ে ওঠা খামেনি জানান, তারা শ্রমজীবী এলাকায় এক কক্ষ ও স্যাঁতসেঁতে বেসমেন্ট ভাগাভাগি করে সাধারণ জীবনযাপন করতেন; অনেক রাতেই খাবার থাকত না।
১৯ বছর বয়সে তিনি কোমের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন এবং খোমেনিসহ জ্যেষ্ঠ আলেমদের কাছে পড়াশোনা করেন। ২৫ বছর বয়সে মাশহাদে ফিরে কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে রাজনৈতিক ইসলামের পক্ষে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। শাহবিরোধী ও খোমেনিপন্থী বক্তৃতার কারণে তাকে অন্তত নয়বার কারাবরণ ও নির্বাসিত হতে হয়। সেখানে তিনি দান সংগ্রহ করে দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারদের সহায়তা করতেন।
ক্রমে তিনি প্রথাভাঙা আলেম হিসেবে পরিচিতি পান। সংগীত ও আধুনিক ফারসি কবিতায় আগ্রহ, ভক্সওয়াগন গাড়ি চালানো ও পাইপ ধূমপান তাকে আলাদা পরিচয় দেয়।
মৃত্যু পর্যন্ত শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ বজায় ছিল বলে এক আত্মীয় জানান। তিনি বিদেশি ও ইরানি উপন্যাস ও ইতিহাস পড়তেন, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র দেখতেন। বিরোধীরাও তার জ্ঞান ও সংস্কৃতিমনস্কতার স্বীকৃতি দিতেন। তবে সমালোচকদের মতে, অন্যদের সাংস্কৃতিক পছন্দের স্বাধীনতা দিতে তিনি অনমনীয় ছিলেন।
একই শহরের আলেম ও সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আলী আবতাহি বলেন, বিপ্লবের আগে মাশহাদে তিনি আধুনিক ধর্মীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঝোঁকসম্পন্ন বিপ্লবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের পর তিনি রক্ষণশীল শক্তির পাশে দাঁড়ান এবং মধ্যপন্থীদের থেকে দূরে সরে যান।
কিছু বিদেশি পর্যবেক্ষকের চোখে তিনি পূর্বসূরি খোমেনির চেয়েও রাজনৈতিকভাবে কঠোর ছিলেন। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ১৯৮০-এর দশকের যুদ্ধে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে খোমেনি “বিষের পেয়ালা” পান করার কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু খামেনির নেতৃত্বে আপসহীন বিজয় ছাড়া অন্য লক্ষ্য দেখা যায়নি।
তিনি “ইসলামি জীবনধারা” প্রচার করেন, যেখানে অল্পবয়সে বিয়ে, বড় পরিবার ও নারীদের বাধ্যতামূলক আবরণ সমর্থন করা হয়। তবে ২০২২ সালের নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলনের পর চাপে পড়ে তিনি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে রাস্তায় বাধ্যতামূলক হিজাব প্রয়োগ না করার অবস্থান থেকে সরাননি।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে তেহরানে এলে তিনি আকবর হাশেমি রাফসানজানির মতো প্রভাবশালী আলেমদের ছায়ায় ছিলেন।
দক্ষ বক্তা ও কৌশলী রাজনীতিক হিসেবে তিনি খোমেনির আস্থা অর্জন করেন, যিনি তাকে সূর্যের মতো আলোকিত অনন্য ব্যক্তিত্ব বলে বর্ণনা করেছিলেন।
প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বিরোধী মুজাহিদিন-ই-খালকের হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ডান হাত পঙ্গু হয়ে যায়।
১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী আলেম মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে খামেনির জন্য বড় পরীক্ষা আসে। রাজনৈতিক সংস্কার ও উন্নত পররাষ্ট্র সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া খাতামির সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শাসনব্যবস্থায় তীব্র লড়াই সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থীরা প্রাধান্য পায় এবং সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়।
পরবর্তীতে কট্টরপন্থীরা মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে সমর্থন দিলেও তিনি সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে অধিক ক্ষমতার দাবি তোলেন, যা খামেনির জন্য অস্বস্তিকর হয়। এরপর মধ্যপন্থী হাসান রুহানি পারমাণবিক চুক্তি এগিয়ে নেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করেন, যা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ায়।
কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। পেজেশকিয়ান ছিলেন খামেনির অধীনে দায়িত্ব পালনকারী শেষ প্রেসিডেন্ট।
উত্তরাধিকার নিয়ে খামেনি কখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি এবং স্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি প্রস্তুত করেননি। বরং তার শাসনব্যবস্থা বিরোধীদের সরিয়ে দিয়েছে। তার ওপর নির্ভরশীল বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তার উত্তরাধিকার রক্ষা করবে নাকি ভিন্ন পথে যাবে, তা স্পষ্ট নয়।
খামেনি রেখে গেছেন তার স্ত্রী, চার আলেম পুত্র, এক কন্যা এবং অন্তত এক ডজন নাতি-নাতনি।
নাজমেহ বোজর্গমেহর 

















