নয় মাস আগে পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার পর এবার কাশ্মীর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। গত বছরের মে মাসে দুই দেশের স্বল্পমেয়াদি সশস্ত্র সংঘাতের পর এই প্রথম ইসলামাবাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে নয়াদিল্লি।
প্রায় চার দশক পর তুলবুল প্রকল্পে নতুন গতি
বৃহস্পতিবার জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ জানান, নয়াদিল্লির সঙ্গে সমন্বয় করে তুলবুল নেভিগেশন প্রকল্পের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হবে। ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া এই অবকাঠামো পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে স্থবির অবস্থায় ছিল।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুটি বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। প্রথমটি তুলবুল প্রকল্প এবং দ্বিতীয়টি আখনুরের কাছে চেনাব নদী থেকে পানি তুলে জম্মু শহরে সরবরাহের উদ্যোগ। তাঁর আশা, শিগগিরই উভয় প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
তুলবুল প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও বিতর্ক
তুলবুল নেভিগেশন প্রকল্পের লক্ষ্য হলো এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা, যা শ্রীনগর থেকে বারামুল্লা পর্যন্ত নদীপথকে শীতকালে চলাচলের উপযোগী রাখবে। প্রকল্পটি উলার হ্রদের মুখে, যেখানে ঝিলম নদী কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত হয়, সেখানে নির্মাণ শুরু হয়েছিল।
ভারতের দাবি, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল প্রাকৃতিক জলাধার থেকে পানির নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে শীতকালে নৌচলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা বজায় রাখা। কিন্তু পাকিস্তানের অভিযোগ ছিল, এটি আসলে একটি ব্যারেজ, যার জলধারণ ক্ষমতা প্রায় ০.৩ মিলিয়ন একর-ফুট। তাদের মতে, ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তি অনুযায়ী ঝিলম নদীর মূল প্রবাহে ভারত কোনো জলাধার নির্মাণ করতে পারে না।
এই মতবিরোধের জেরেই ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৩০ শতাংশ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল। শুরুতে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯৭.৮ মিলিয়ন রুপি। তবে দীর্ঘ বিরতির পর এখনো নতুন করে কোনো বাজেট ঘোষণা করা হয়নি।
নদী ব্যবস্থাপনায় ভারতের কৌশলগত পরিবর্তন
তুলবুল প্রকল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগকে বিশ্লেষকেরা ভারতের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এতদিন বিরোধ এড়িয়ে চলার কৌশল নিলেও এখন কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে প্রবাহিত নদীগুলোর পানি অভ্যন্তরীণভাবে আরও বেশি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে দিল্লি।
সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব—এই তিনটি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী জম্মু ও কাশ্মীর হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। ফলে এসব নদী ঘিরে যেকোনো অবকাঠামো প্রকল্প কেবল অর্থনৈতিক নয়, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নেও সংবেদনশীল।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক প্রবীণ ডোন্থি মনে করেন, তুলবুলের মতো পুরোনো প্রকল্পে ফের হাত দেওয়া ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়াতে পারে। তাঁর মতে, সিন্ধু জল চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্টতা না থাকলে এমন পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রাজ্যের অধিক ক্ষমতা ও পূর্ণ রাজ্য মর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রচেষ্টায় মুখ্যমন্ত্রীর জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত নয়াদিল্লির কৌশলগত বিবেচনাই প্রকল্পের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
রাজনৈতিক বার্তা নাকি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ
আন্তর্জাতিক জল সহযোগিতা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অশোক সোয়াইন বলেন, চুক্তি স্থগিতের পর তুলবুল পুনরুজ্জীবন একদিকে রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। ভারতের দৃষ্টিতে এটি অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রকল্প হলেও, সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে স্থায়ী জল অবকাঠামো পাকিস্তানের কাছে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
তাঁর মতে, এমন প্রকল্প কোনো পক্ষকেই পানির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয় না, তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। ভারতে এটি সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে, আর পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এটি জলকে চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগকে আরও জোরদার করতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে জলসংক্রান্ত বিরোধ প্রযুক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই চাপে রয়েছে। ফলে সিন্ধু জল চুক্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনিশ্চয়তার মুখে।
এই পরিস্থিতিতে তুলবুল প্রকল্প পুনরায় চালু হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে জলকূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















