দুবাই থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, রবিবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানে ভয়াবহ এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো শহর। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
তেহরানে বিস্ফোরণের কেন্দ্র ও লক্ষ্যস্থল তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না হলেও আকাশে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায় এবং মাটি কেঁপে ওঠে। বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল ছিল এমন সব এলাকা যেখানে পুলিশের সদর দপ্তর, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বিপ্লবী আদালত এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবন অবস্থিত।
নতুন সংঘাতের সূচনা
শনিবারের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষমতায় আসার সময় ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ঘোষণা করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো আট মাসের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করলেন।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক নেতৃত্ব ও পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে খামেনির হত্যাকাণ্ড এবং ট্রাম্পের ইরানি জনগণকে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কা বেড়েছে।
ইরানের হুঁশিয়ারি ও ট্রাম্পের পাল্টা বার্তা
ইরানের মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছে, এই ‘মহা অপরাধের’ জবাব দেওয়া হবে। বিপ্লবী গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তারা ইসরায়েলি ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ‘আপনারা আমাদের লাল রেখা অতিক্রম করেছেন, এর মূল্য আপনাদের দিতে হবে।’
এর জবাবে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে সতর্ক করে বলেন, ইরান প্রতিশোধ নিলে আরও ভয়াবহ শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
উপসাগরজুড়ে হামলার বিস্তার
প্রথম হামলার পরপরই ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে। ইসরায়েলে একাধিক হামলায় একজন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও। দুবাইয়ের আকাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবর্ষণ শোনা যায় এবং বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আবুধাবিতে ইরানি হামলার ধ্বংসাবশেষে দুজন নিহত হন। শহরের প্রধান বন্দরে আগুন লাগে এবং বিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেলের সামনেও ক্ষতি হয়।
ওমান, সৌদি আরব, জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারও জানিয়েছে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। ইরাকে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে।
বৈশ্বিক বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে, তবে বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধাক্কা খেতে পারে। ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে গেছে।
খামেনির মৃত্যু ও নেতৃত্বের সংকট
দীর্ঘ দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি দেশের প্রধান নীতিনির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতেন। তাঁর নেতৃত্বে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিপ্লবী গার্ড ছিল ক্ষমতার মূল স্তম্ভ। তাঁর মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত একটি পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘে ইরানের এক কূটনীতিক দাবি করেছেন, শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
দক্ষিণ ইরানে একটি বালিকাবিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১১৫ জন নিহত হওয়ার খবর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় বহু হতাহতের তথ্য পাওয়া গেছে।
শোক ও প্রতিক্রিয়া
খামেনির মৃত্যুর খবরে তেহরানের কিছু এলাকায় উল্লাসের খবর পাওয়া গেলেও মাশহাদে ইমাম রেজা মাজারে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সরকার ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তারা কংগ্রেসের উভয় দলের নেতাদের আগেই অবহিত করেছিল। তবে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গত বছরের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও, মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে ইরান অবকাঠামো পুনর্গঠন শুরু করেছিল। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান উন্নত মানের সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা অস্ত্রোপযোগী উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ইরান জানিয়েছে, জুনের পর তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেনি, তবে তাদের অধিকার বজায় আছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের বোমাবিদ্ধ স্থাপনাগুলোতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, দুটি স্থাপনায় নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে, যা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















