নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হবে শান্তি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এখন সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে নিজের প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু মার্কিন সেনাদের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় রাজনৈতিক জুয়া
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদনের মাধ্যমে ট্রাম্প এমন এক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দিয়েছেন, যা আকারে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুই হাজার তিন সালে ইরাক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের শুরুতেই মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে। ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও কঠোর আঘাত সামনে আসতে পারে।
‘শান্তির প্রতিশ্রুতি’ থেকে যুদ্ধের পথে
ক্ষমতায় আসার সময় ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি নতুন যুদ্ধ শুরু করবেন না, বরং বিদ্যমান সংঘাতগুলো শেষ করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতায় আসার এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই তিনি সাতটি দেশে সামরিক পদক্ষেপ অনুমোদন করেছেন।
তবুও ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযানকে সফল বলে তুলে ধরছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনা এবং ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা এই অভিযানের বড় সাফল্য। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।
জনমত ও রাজনৈতিক চাপ
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধ নিয়ে সমর্থন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন ভোটারই ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সিদ্ধান্ত সমর্থন করছেন না। এক জরিপে দেখা যায় প্রায় ঊনষাট শতাংশ মানুষ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন, আর মাত্র সাতাশ শতাংশ মানুষ সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছেন।

ডেমোক্র্যাট নেতারা এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না করে বিদেশি সংঘাতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
নিজের শিবিরেও বাড়ছে প্রশ্ন
ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরেও এখন মতভেদ দেখা যাচ্ছে। তার কিছু ঘনিষ্ঠ সমর্থক প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, ‘আমেরিকা আগে’ নীতির সঙ্গে বিদেশে নতুন যুদ্ধের এই পদক্ষেপ সাংঘর্ষিক।
তবে ট্রাম্পের অনেক সমর্থক এখনো অপেক্ষা করছেন যুদ্ধের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত অভিযানের ফলাফলই নির্ধারণ করবে এটি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে নাকি বড় ক্ষতির কারণ হবে।

সামনে আরও বড় অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় বা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে, তবে তা মার্কিন রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য এটি কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একসময় নিজেকে শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা ট্রাম্প এখন এমন এক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গেছেন, যার ফলাফল শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যতকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















