আর্কটিকের নিস্তব্ধ বরফময় প্রান্তরে, উত্তর মেরুর কাছাকাছি একটি ছোট কেবিনে কাটানো দীর্ঘ ১৯ মাসের অভিজ্ঞতা এখন বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। নরওয়ের নাগরিক বিজ্ঞানী হিল্ডে ফালুন স্ট্রোমের সেই জীবনযাপন শুধু অভিযানের গল্প নয়, বরং পৃথিবীকে রক্ষা করার এক শক্তিশালী আহ্বান।
আর্কটিকের পথে শৈশবের স্বপ্ন
হিল্ডে ফালুন স্ট্রোম বড় হয়েছেন নরওয়ের রাজধানী অসলো শহরের কাছে। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি আর বরফময় অঞ্চলের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল। ১৯৯৫ সালে তিনি আর্কটিক অঞ্চলের স্বালবার্ডে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের শহর লংইয়ারবিয়েনে তিনি তার স্বামী স্টেইনারের সঙ্গে থাকেন।
অনুসন্ধানী, পরিবেশ রক্ষার দূত এবং জলবায়ু আন্দোলনের সক্রিয় কণ্ঠ হিসেবে স্ট্রোম দীর্ঘদিন ধরে আর্কটিক সংরক্ষণের পক্ষে কাজ করছেন। তিনি স্বালবার্ড অভিযানের নেতৃত্ব দেন এবং সহকর্মী সুনিভা সোরবির সঙ্গে শুরু করেন নাগরিক বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ “হার্টস ইন দ্য আইস”।
বরফের দেশে এক নির্জন কেবিন
স্ট্রোম যে কেবিনে থাকতেন তার নাম বামসেবু। মাত্র ২০ বর্গমিটার আয়তনের এই কাঠের ঘরটি ১৯৩০ সালে তিমি শিকারের মৌসুমি আশ্রয় হিসেবে তৈরি হয়েছিল। সেখানে কোনো বিদ্যুৎ, গরমের ব্যবস্থা কিংবা পানির সংযোগ নেই।
উত্তর মেরুর কাছাকাছি এই অঞ্চলে শীতের দীর্ঘ রাত আর গ্রীষ্মের অবিরাম সূর্যালোক প্রকৃতিকে এক রহস্যময় রূপ দেয়। বরফঢাকা গ্লেসিয়ার, তীব্র হিমেল বাতাস আর চারদিকে মানুষের অনুপস্থিতি — সব মিলিয়ে যেন ভিনগ্রহের মতো এক পরিবেশ।
কেবিনে পৌঁছাতে তাকে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। বরফে ঢাকা গ্লেসিয়ার, পাহাড়ি রিজ এবং জমে যাওয়া দুটি ফিয়র্ড পার হয়ে তবেই সেখানে পৌঁছানো যায়। তিনি তুষারযানে করে যেতেন, সঙ্গে থাকত খাবার, জ্বালানি ও গবেষণার সরঞ্জামভর্তি স্লেজ।
মহামারির মাঝেও থামেনি গবেষণা
স্ট্রোম এবং সুনিভা সোরবি মূলত নয় মাসের জন্য সেখানে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মহামারি শুরু হলে তাদের অভিযান দীর্ঘ হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ মাস।
একদিন স্যাটেলাইট বার্তায় তারা জানতে পারেন একটি অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। পরে বুঝতে পারেন এটি বিশ্বব্যাপী মহামারি। সেই সময় কোনো জাহাজ আসছিল না, ফলে তারা কার্যত বরফের মধ্যে আটকে পড়েন।
তবুও তারা ফিরে আসেননি। কারণ সেখানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছিল। আর্কটিকের মেরুভালুক ও তুন্দ্রা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের তথ্য তখন আর কেউ সংগ্রহ করতে পারছিল না। সীমিত স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে তারা বিশ্বজুড়ে এক লক্ষের বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা তুলে ধরেন।
১০৪ মেরুভালুকের মুখোমুখি
স্ট্রোমের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ ছিল মেরুভালুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তিনি মোট ১০৪টি ভিন্ন মেরুভালুক দেখেছেন।
এক রাতে একটি বিশাল মেরুভালুক কেবিনের দেয়ালে আঘাত করে ছাদে উঠে পড়ে। তখন তিনি সিগন্যাল বন্দুক ও রাবারের গুলি নিয়ে বাইরে বের হন। মাত্র ত্রিশ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রাণীর সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত চোখাচোখি হয়। পরে ধীরে ধীরে ভালুকটি সরে যায়।
তার মতে, মেরুভালুকের বেঁচে থাকার জন্য সমুদ্রের বরফ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই বরফ দ্রুত গলছে। ফলে এই প্রাণীগুলো এখন সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা প্রজাতির মধ্যে একটি।
কঠিন জীবনে ছোট ছোট মানবিক মুহূর্ত
আর্কটিকের কঠিন জীবনেও তারা ছোট ছোট মানবিক রীতি বজায় রেখেছিলেন। প্রতিদিন সকালে বরফ কেটে পানি গলানো, সরল খাবার রান্না, ঝড়ের মাঝেও কুকুরকে নিয়ে হাঁটা — সবই ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবন।
ক্রিসমাস এবং নববর্ষের রাতে স্ট্রোম একটি পোশাক পরতেন, চুল সাজাতেন, সামান্য সাজগোজও করতেন। তার মতে, এতে মনে পড়ে যায় যে কঠিন পরিবেশেও তিনি একজন নারী, একজন মানুষ।
একদিন হেলিকপ্টারে করে স্বালবার্ডের নতুন ধর্মযাজক সেখানে আসেন। সঙ্গে ছিল কিছু ফল, সবজি এবং স্ট্রোমের স্বামী। কয়েক ঘণ্টার সেই সাক্ষাৎ তাদের কাছে ছিল অমূল্য স্মৃতি।
পৃথিবীর জন্য এক শক্ত বার্তা
আর্কটিকে দীর্ঘ শীত কাটিয়ে স্ট্রোম উপলব্ধি করেছেন মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়, বরং প্রকৃতিরই অংশ। জীবনে সুখী হতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না।
তার মতে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা যত বেশি শিক্ষা ও নেতৃত্বের সুযোগ পাবে, ততই পৃথিবী হবে আরও শান্তিপূর্ণ এবং টেকসই।
আর্কটিকের বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে তার বার্তা একটাই — পৃথিবীকে বাঁচাতে এখনই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















