০৮:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
পাকিস্তানের বিশ্বস্বীকৃতি: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা—জয়রাম রমেশের তীব্র আক্রমণ ভারতীয় রাজনীতিতে বড় চাল, বাংলায় ২৮৪ প্রার্থী ঘোষণা কংগ্রেসের—হেভিওয়েটদের নামেই জমল লড়াই সব আসনে ‘আমি-ই প্রার্থী’ বার্তা মমতার, ভোটের আগে আবেগঘন প্রচার তৃণমূলের সাত মাসে ব্যাংক থেকে ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বাড্ডায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল যুবকের, ইউ-লুপ ব্রিজে মর্মান্তিক সংঘর্ষ সুন্দরবনে শুরু হচ্ছে মধু সংগ্রহ মৌসুম: জীবনঝুঁকি, চাঁদাবাজি আর লক্ষ্যমাত্রার চাপ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি থমকে: অর্থায়ন ও নীতিগত ঘাটতিতে ঝুঁকিতে জলবায়ুপ্রবণ অঞ্চল ফরিদপুরে আগুনে পুড়ে কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু, নাশকতার অভিযোগে চাঞ্চল্য পাবনা সফর শেষে ঢাকায় ফিরছেন রাষ্ট্রপতি, চার দিনের ব্যস্ত কর্মসূচি শেষ ধোনিহীন শুরুতেই নতুন সিএসকে: বদলের পথে কি মিলবে সাফল্যের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় যুদ্ধযন্ত্র: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে যা জানা যায়

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদেশের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ভূখণ্ডে থাকা এসব ঘাঁটি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নীতির মূল অংশ। এর লক্ষ্য বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা, মিত্রদেশগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্ণনা অনুযায়ী, এই হুমকির প্রধান উৎস হিসেবে ইরানকে দেখানো হয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর একটি প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এর কার্যক্রম পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং আশপাশের সমুদ্রসীমা জুড়ে বিস্তৃত। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে রয়েছে সামরিক সদরদপ্তর, লজিস্টিক কেন্দ্র, বিমানঘাঁটি ও সমুদ্রবন্দর।

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার আগে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু ঘাঁটিতে সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে দেয়। তবে একই সময়ে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের ফলে পুরো অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

পঞ্চম নৌবহরের ভূমিকা
১৯৯৫ সালে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ অভিযানের পর মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর পুনরায় সক্রিয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, অস্থির এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষার নামে স্থায়ী নৌ উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল।

America's Gulf war machine: What we know about the US military network in  the Middle East

বর্তমানে এই নৌবহর প্রায় ২৫ লাখ বর্গমাইল সমুদ্র এলাকা তদারকি করে। এর সদরদপ্তর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ ঘাঁটিতে।

এই ঘাঁটি থেকে বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও সাবমেরিন পরিচালিত হয়। অতীতে এই নৌবহর তেলবাহী জাহাজ সুরক্ষার জন্য ‘আর্নেস্ট উইল’ অভিযান এবং ইরানের তেল প্ল্যাটফর্মে হামলার জন্য ‘প্রেয়িং ম্যান্টিস’ অভিযানে অংশ নেয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ, আইএসআইএসবিরোধী অভিযান এবং ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে এ নৌবহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে এই নৌবহর সরাসরি যুক্ত রয়েছে।

বাহরাইন: প্রধান নৌঘাঁটি
বাহরাইনের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি এবং পঞ্চম নৌবহরের কেন্দ্রীয় কমান্ড। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এই ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়।

ঘাঁটির পাশেই খলিফা বিন সালমান বন্দর রয়েছে, যা মার্কিন নৌবহরের জন্য প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে যুদ্ধজাহাজ মেরামত, সরবরাহ এবং চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে।

সাধারণ সময়ে এখানে প্রায় ৮,৫০০ মার্কিন সামরিক সদস্য অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তা কমে প্রায় ১,০০০ এ নেমে এসেছে। ঘাঁটিটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সুরক্ষিত এবং এখানে একটি বড় মহাকাশ যোগাযোগ ও সিগন্যাল গোয়েন্দা কেন্দ্রও রয়েছে।

সংঘাত শুরুর প্রথম দিনেই এই ঘাঁটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ কামিকাজে ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

কাতার: আল উদেইদ বিমানঘাঁটি
১৯৯৬ সালে কাতার সরকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় আল উদেইদ বিমানঘাঁটি নির্মাণ করে। উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করা।

২০০১ সালে আফগানিস্তান অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এই ঘাঁটি ব্যবহার করে। পরে ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এখান থেকে বিমান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়।

বর্তমানে এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি। শান্তিকালে এখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা থাকতে পারে, যদিও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমিয়ে প্রায় ৫ হাজার করা হয়েছে।

এই ঘাঁটি থেকে বি-৫২ এবং বি-১বি বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, সি-১৭ পরিবহন বিমান, রিফুয়েলিং বিমান এবং গ্লোবাল হক ও এমকিউ-৯ ড্রোন পরিচালনা করা হয়। প্রতিদিন হাজারের বেশি বিমান উড্ডয়ন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এই ঘাঁটির।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ঘাঁটির সতর্কতা রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

কুয়েত: মার্কিন লজিস্টিক কেন্দ্র
কুয়েতের তিনটি প্রধান মার্কিন সামরিক স্থাপনা—ক্যাম্প আরিফজান, ক্যাম্প বুহরিং এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতিতে এগুলো আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখানে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের এসব ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বিভিন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ হতাহতের ঘটনা এখানেই ঘটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: আল ধাফরা ও জেবেল আলি
সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র হলো আল ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং জেবেল আলি বন্দর।

আবুধাবি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল ধাফরা ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের যৌথ বিমানঘাঁটি। এখানে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করে এবং বিমানগুলো মূলত নজরদারি, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ ও নির্ভুল হামলা পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে জেবেল আলি বন্দর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় লজিস্টিক কেন্দ্র। এখানে যুদ্ধজাহাজ মেরামত, সরবরাহ ও পুনরায় প্রস্তুত করার কাজ করা হয়। বন্দরে একসঙ্গে প্রায় ২০টি বড় জাহাজ নোঙর করার সুবিধা রয়েছে।

America's Gulf war machine: What we know about the US military network in  the Middle East

সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান এই দুই স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে রানওয়ে, হ্যাঙ্গার এবং বন্দর অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

ওমান: ঘাঁটির পরিবর্তে প্রবেশাধিকার
ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় স্থায়ী ঘাঁটি নেই। ১৯৮০-এর দশকের একটি চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কয়েকটি বিমানঘাঁটি ও বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

থুমরাইত ও মাসিরাহ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত ব্যবহার করে, যেখানে ট্যাংকার বিমান, নজরদারি বিমান এবং ড্রোন পরিচালনা করা হয়। এছাড়া দুকম ও সালালাহ বন্দর মার্কিন নৌবাহিনীর সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ওমান মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করায় সাধারণত ইরান সরাসরি এই দেশকে লক্ষ্যবস্তু করে না। তবে মার্চের শুরুতে ইয়েমেনভিত্তিক ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীর একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়।

সৌদি আরব: প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র সৌদি আরব। এখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হলো প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, যা রিয়াদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

১৯৮২ সালে নির্মিত এই ঘাঁটি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৯ সালে হুথি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও এখানে কার্যক্রম জোরদার করে এবং চারটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি মোতায়েন করা হয়।

ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি সামরিক ঘাঁটি এবং আরামকো তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ইরান সম্ভবত তাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান বন্ধ করে।

তবে পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ যদি আঞ্চলিক দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তানের বিশ্বস্বীকৃতি: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা—জয়রাম রমেশের তীব্র আক্রমণ

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় যুদ্ধযন্ত্র: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে যা জানা যায়

০২:৫৩:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদেশের অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ভূখণ্ডে থাকা এসব ঘাঁটি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নীতির মূল অংশ। এর লক্ষ্য বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা, মিত্রদেশগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্ণনা অনুযায়ী, এই হুমকির প্রধান উৎস হিসেবে ইরানকে দেখানো হয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর একটি প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এর কার্যক্রম পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং আশপাশের সমুদ্রসীমা জুড়ে বিস্তৃত। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে রয়েছে সামরিক সদরদপ্তর, লজিস্টিক কেন্দ্র, বিমানঘাঁটি ও সমুদ্রবন্দর।

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার আগে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু ঘাঁটিতে সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে দেয়। তবে একই সময়ে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের ফলে পুরো অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

পঞ্চম নৌবহরের ভূমিকা
১৯৯৫ সালে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ অভিযানের পর মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর পুনরায় সক্রিয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, অস্থির এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষার নামে স্থায়ী নৌ উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল।

America's Gulf war machine: What we know about the US military network in  the Middle East

বর্তমানে এই নৌবহর প্রায় ২৫ লাখ বর্গমাইল সমুদ্র এলাকা তদারকি করে। এর সদরদপ্তর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত ‘নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন’ ঘাঁটিতে।

এই ঘাঁটি থেকে বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও সাবমেরিন পরিচালিত হয়। অতীতে এই নৌবহর তেলবাহী জাহাজ সুরক্ষার জন্য ‘আর্নেস্ট উইল’ অভিযান এবং ইরানের তেল প্ল্যাটফর্মে হামলার জন্য ‘প্রেয়িং ম্যান্টিস’ অভিযানে অংশ নেয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ, আইএসআইএসবিরোধী অভিযান এবং ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে এ নৌবহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে এই নৌবহর সরাসরি যুক্ত রয়েছে।

বাহরাইন: প্রধান নৌঘাঁটি
বাহরাইনের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি বাহরাইন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি এবং পঞ্চম নৌবহরের কেন্দ্রীয় কমান্ড। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এই ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়।

ঘাঁটির পাশেই খলিফা বিন সালমান বন্দর রয়েছে, যা মার্কিন নৌবহরের জন্য প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে যুদ্ধজাহাজ মেরামত, সরবরাহ এবং চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে।

সাধারণ সময়ে এখানে প্রায় ৮,৫০০ মার্কিন সামরিক সদস্য অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তা কমে প্রায় ১,০০০ এ নেমে এসেছে। ঘাঁটিটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সুরক্ষিত এবং এখানে একটি বড় মহাকাশ যোগাযোগ ও সিগন্যাল গোয়েন্দা কেন্দ্রও রয়েছে।

সংঘাত শুরুর প্রথম দিনেই এই ঘাঁটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ কামিকাজে ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

কাতার: আল উদেইদ বিমানঘাঁটি
১৯৯৬ সালে কাতার সরকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় আল উদেইদ বিমানঘাঁটি নির্মাণ করে। উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলা করা।

২০০১ সালে আফগানিস্তান অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এই ঘাঁটি ব্যবহার করে। পরে ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এখান থেকে বিমান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়।

বর্তমানে এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি। শান্তিকালে এখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা থাকতে পারে, যদিও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমিয়ে প্রায় ৫ হাজার করা হয়েছে।

এই ঘাঁটি থেকে বি-৫২ এবং বি-১বি বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, সি-১৭ পরিবহন বিমান, রিফুয়েলিং বিমান এবং গ্লোবাল হক ও এমকিউ-৯ ড্রোন পরিচালনা করা হয়। প্রতিদিন হাজারের বেশি বিমান উড্ডয়ন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এই ঘাঁটির।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ঘাঁটির সতর্কতা রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

কুয়েত: মার্কিন লজিস্টিক কেন্দ্র
কুয়েতের তিনটি প্রধান মার্কিন সামরিক স্থাপনা—ক্যাম্প আরিফজান, ক্যাম্প বুহরিং এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতিতে এগুলো আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখানে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েতের এসব ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বিভিন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ হতাহতের ঘটনা এখানেই ঘটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: আল ধাফরা ও জেবেল আলি
সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র হলো আল ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং জেবেল আলি বন্দর।

আবুধাবি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল ধাফরা ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের যৌথ বিমানঘাঁটি। এখানে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করে এবং বিমানগুলো মূলত নজরদারি, আকাশে জ্বালানি সরবরাহ ও নির্ভুল হামলা পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে জেবেল আলি বন্দর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় লজিস্টিক কেন্দ্র। এখানে যুদ্ধজাহাজ মেরামত, সরবরাহ ও পুনরায় প্রস্তুত করার কাজ করা হয়। বন্দরে একসঙ্গে প্রায় ২০টি বড় জাহাজ নোঙর করার সুবিধা রয়েছে।

America's Gulf war machine: What we know about the US military network in  the Middle East

সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান এই দুই স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে রানওয়ে, হ্যাঙ্গার এবং বন্দর অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

ওমান: ঘাঁটির পরিবর্তে প্রবেশাধিকার
ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় স্থায়ী ঘাঁটি নেই। ১৯৮০-এর দশকের একটি চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কয়েকটি বিমানঘাঁটি ও বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

থুমরাইত ও মাসিরাহ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত ব্যবহার করে, যেখানে ট্যাংকার বিমান, নজরদারি বিমান এবং ড্রোন পরিচালনা করা হয়। এছাড়া দুকম ও সালালাহ বন্দর মার্কিন নৌবাহিনীর সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ওমান মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করায় সাধারণত ইরান সরাসরি এই দেশকে লক্ষ্যবস্তু করে না। তবে মার্চের শুরুতে ইয়েমেনভিত্তিক ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীর একটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়।

সৌদি আরব: প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র সৌদি আরব। এখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হলো প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, যা রিয়াদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

১৯৮২ সালে নির্মিত এই ঘাঁটি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৯ সালে হুথি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবারও এখানে কার্যক্রম জোরদার করে এবং চারটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি মোতায়েন করা হয়।

ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি সামরিক ঘাঁটি এবং আরামকো তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ইরান সম্ভবত তাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান বন্ধ করে।

তবে পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ যদি আঞ্চলিক দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।