ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিশাল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এই বাহিনীকে অনেক বিশ্লেষক ইরানে যে কোনো ধরনের ক্ষমতার পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখেন। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়ও এই বাহিনী দ্রুত দেশের ভেতরে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করেছে।
তেহরানে দ্রুত মোতায়েন
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যরা রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন বড় শহরের এলাকায় মোতায়েন হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, সাধারণ পোশাক পরা সশস্ত্র সদস্যরা বিভিন্ন চেকপয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন।
তারা গাড়ি ও মোবাইল ফোন তল্লাশি করছিলেন এবং যুদ্ধের সমর্থনের কোনো ইঙ্গিত আছে কি না তা খুঁজছিলেন। অনেক জায়গায় কালো রঙের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের গাড়িও রাখা হয়েছিল, বিশেষ করে বন্ধ স্কুলের মাঠে, যাতে সেগুলো সহজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য না হয়।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক সাঈদ গোলকার বলেন, বাহিনীটি একদিকে বাইরের বিশ্বের কাছে নিয়ন্ত্রণে থাকার একটি চিত্র তুলে ধরতে চায়, অন্যদিকে দেশের ভেতরে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চায় যাতে কেউ রাস্তায় নামার সাহস না পায়।
কেন এই বাহিনী এত গুরুত্বপূর্ণ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে অস্ত্র নামিয়ে রেখে সরকারের পরিবর্তনের জন্য জনগণের সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।
ইরানকে বাইরে থেকে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে হলেও বাস্তবে দেশটির ক্ষমতার কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে এই সামরিক বাহিনী। তাদের সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এতটাই বিস্তৃত যে এটি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইআরজিসি কীভাবে গড়ে ওঠে
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি দেশের প্রচলিত সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না। সেনাবাহিনীকে ফার্সি ভাষায় আরতেশ বলা হয় এবং খোমেনির ধারণা ছিল এই বাহিনীর সঙ্গে সাবেক শাহ শাসনের সম্পর্ক গভীর।
এই কারণেই তিনি বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্য আলাদা একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন, যার নাম ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস। এর প্রাথমিক সদস্যরা ছিল বিভিন্ন এলাকার কমিটি ও মসজিদকেন্দ্রিক সংগঠনের কর্মীরা, যারা নিজেদের এলাকায় বিপ্লবের শত্রুদের প্রতিরোধ করত।

১৯৮০ সালে ইরাকের আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া আট বছরের যুদ্ধ এই বাহিনীকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করে তোলে। তখন তারা নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে, কারণ বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করেন। ধীরে ধীরে এই বাহিনী রাজনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার শুরু করে।
যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন কাজ পরিচালনার জন্য তারা একটি আলাদা শাখা তৈরি করে। বর্তমানে তারা সড়ক, বাঁধ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেও জড়িত। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সময় তারা তেলসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের মাধ্যমেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২৫ শতাংশের ওপর সরাসরি এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, আর প্রকৃত প্রভাব এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের শাসক সাদ্দাম হুসেইনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্স তখন লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও গাজায় বিভিন্ন শিয়া সংগঠন ও মিলিশিয়াকে সমর্থন দিয়ে একটি আঞ্চলিক জোট তৈরি করে।
এর ফলে এই বাহিনী শুধু সামরিক শক্তিই নয়, ইরানের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশেও পরিণত হয়।

বাহিনীর কাঠামো
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। ইরানের সামগ্রিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা পুলিশসহ প্রায় ১৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
সব সদস্যই সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নয়। অনেকেই নির্মাণ বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো বিভিন্ন খাতে কাজ করেন।
এই বাহিনীর চারটি প্রধান সামরিক শাখা রয়েছে। এগুলো হলো স্থল বাহিনী, নৌ বাহিনী, মহাকাশ বা ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী এবং কুদস ফোর্স, যা বিদেশি অভিযানের দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাসিজ নামে পরিচিত স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীও রয়েছে।
মোজাইক কৌশল
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী একটি বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো অনুসরণ করে, যাকে মোজাইক কৌশল বলা হয়। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো, যদি কোনো কারণে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তবুও স্থানীয় কমান্ডাররা নিজেদের অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবেন।
২০০৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের সময় দ্রুত ক্ষমতা ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে এই কৌশল আরও শক্তিশালী করা হয়।

বর্তমানে ইরানের প্রতিটি প্রদেশের জন্য একটি করে কমান্ড রয়েছে, মোট ৩১টি কমান্ড। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি এলাকায় ছোট ছোট ইউনিট রয়েছে, যেগুলো প্রয়োজনে দ্রুত বিক্ষোভ দমন করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিও এই কৌশল অনুযায়ী মোকাবিলা করা হচ্ছে।
বাহিনীর নেতৃত্ব
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দুইজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। এর পর গত ১ মার্চ নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি।
তিনি আগে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে কুদস ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কমান্ডারদের একজন ছিলেন। আট বছর ধরে তিনি এই বাহিনীর নেতৃত্বও দিয়েছেন।
ভাহিদির বিরুদ্ধে বিদেশে সন্ত্রাসী হামলা সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় ৮৫ জন নিহত হন। আর্জেন্টিনা এই ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছিল, যদিও ইরান সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি ভবিষ্যতে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার হতে পারেন। ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এই বাহিনীর ভেতরেও এক ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। কিছু সদস্য কঠোরভাবে সরকারপন্থী হলেও অনেক সদস্য সাধারণ সৈনিক, যারা ইরানি সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আসেন।
তবুও বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় দুই থেকে তিন হাজার প্রভাবশালী কর্মকর্তা আছেন যারা কঠোর অবস্থানে আছেন এবং যাদের ক্ষমতা ও সম্পদ এই বাহিনীর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রয়োজনে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত বলে মনে করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















