লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ছোট শহর। বহু বছর ধরে যুদ্ধ, বোমা হামলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই সেখানে জীবন কাটছে মানুষের। সেই বাস্তবতার প্রতীক যেন ৬৬ বছর বয়সী হুসাইন খ্রাইস। মাত্র কয়েক দিন আগেও তিনি গর্বের সঙ্গে দেখাচ্ছিলেন নিজের নতুন করে মেরামত করা বাড়ি। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ আবারও তাকে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে।
যুদ্ধের আগুনে আবারও ঘরছাড়া
দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী শহর খিয়াম। ইসরায়েলের সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এই শহরই ছিল হুসাইন খ্রাইসের বসবাসের জায়গা। গত বছর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষে তার বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বহু কষ্টে নিজের সঞ্চয় থেকে প্রায় ২৫ হাজার ডলার খরচ করে তিনি বাড়িটি মেরামত করেছিলেন।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর আবারও যুদ্ধের মুখে পড়ে পুরো অঞ্চল। প্রাণ বাঁচাতে পরিবারসহ বাড়ি ছেড়ে রাজধানী বৈরুতের কাছে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে।

হুসাইন খ্রাইসের কণ্ঠে এখন শুধু উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। তিনি বলছেন, এত কষ্ট করে তৈরি করা বাড়ি আর শুরু করা ব্যবসা এখনো আছে কিনা সেটাও তিনি জানেন না।
চার দশকে চারবার ঘরবাড়ি হারানোর গল্প
এটাই প্রথম নয়। গত চার দশকে অন্তত চারবার তাকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। প্রতিবারই যুদ্ধ শেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরে ফিরে গিয়ে আবার ধীরে ধীরে ঘর বানিয়েছেন তিনি।
এই দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে ক্লান্ত করে তুলেছে। তার ভাষায়, বারবার একই গল্প। প্রথমে বাস্তুচ্যুতি, তারপর ফিরে আসা, আবার নতুন করে বাড়ি তৈরি। তারপর আবার যুদ্ধ, আবার পালানো। এমন জীবন কতদিন চলবে তা তিনি নিজেও জানেন না।
যুদ্ধের বোঝা বইছে সাধারণ মানুষ

লেবাননের হাজার হাজার পরিবারের মতো হুসাইন খ্রাইসকেও বাড়ি পুনর্গঠনের পুরো খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা মেলেনি। হিজবুল্লাহর সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি থেকেও খুব বেশি সাহায্য পাওয়া যায়নি।
২০১৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর দেশটির ব্যাংক ব্যবস্থায় জমা অর্থ তুলতেও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে নিজেদের সঞ্চয় খরচ করেই অনেক পরিবারকে ভাঙা বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছে।
নতুন সংঘাতে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় তিন লাখ মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। ইসরায়েলের হামলা এবং সেনাবাহিনীর সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ মিলিয়ে লেবাননের প্রায় আট শতাংশ এলাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
হুসাইন খ্রাইস এখন প্রায় বিশজন বাস্তুচ্যুত আত্মীয়ের সঙ্গে একসঙ্গে থাকছেন। কেউ এসেছে খিয়াম থেকে, কেউ বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে। প্রতিদিন টেলিভিশনের খবর দেখে তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন নিজের শহরের পরিস্থিতি।
স্মৃতির টানে ফিরে যেতে চান
বাড়ির কথা মনে পড়লে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত ছিল সন্তানদের ঘরের দরজা খুলে দেয়ালে ঝুলানো নাতি-নাতনিদের ছবিগুলো দেখা।
তিনি বলেন, সেই দৃশ্য পৃথিবীর সব ধনসম্পদের থেকেও বেশি মূল্যবান। আবার সেই বাড়িতে ফিরে গিয়ে সেই ছবিগুলো দেখতে চান তিনি।
তবে বাড়িটি এখনো আছে কিনা তা তিনি জানেন না। তবু আশায় বুক বাঁধছেন। যদি বাড়ি না-ও থাকে, তবুও তিনি আবার ফিরে যাবেন। আর আগের মতোই আবার নতুন করে বাড়ি তৈরি করবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















